সারের মজুত নিয়ে স্বস্তি, চাহিদার চেয়ে বেশি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন

সময়: 10:46 am - September 15, 2026 |

মিজানুর রহমান :

রবি ও বোরো মৌসুমে কৃষি উৎপাদন নির্বিঘ্ন রাখতে দেশে সারের চাহিদার তুলনায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি সরবরাহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আগামী অক্টোবর মাসের জন্য ৬৪ জেলার বিপরীতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার ১৪ সেপ্টেম্বরের চিঠি ও সংযুক্ত জেলাওয়ারি বরাদ্দ তালিকা থেকে এ তথ্য জানা গেছে। নথি অনুযায়ী, দেশে সারের মোট চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সরবরাহের জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন সার সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশের ৬৪ জেলার জন্য টিএসপি সারের মোট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৫২ মেট্রিক টন। এর পুরো পরিমাণই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিএপি সারের অক্টোবরের চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ১ হাজার মেট্রিক টন এবং বিএডিসি ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন বরাদ্দ করেছে। অর্থাৎ ডিএপির ক্ষেত্রেও চাহিদার পুরো পরিমাণ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে এমওপি সারের চাহিদা ৯৩ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টন। সমপরিমাণ এমওপি সারও জেলা-ভিত্তিক বরাদ্দের আওতায় রাখা হয়েছে। ফলে অক্টোবর মাসে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি—এই তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সারের মোট জেলা-ভিত্তিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সমপরিমাণ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মজুত ও পরিবহনেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার:

গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ১৮ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন মজুত ছিল। এর পাশাপাশি পরিবহনের পথে ছিল টিএসপি ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টন, ডিএপি ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন। কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার চাহিদা নিরূপণ, আগাম আমদানি, মজুত, জেলাভিত্তিক বরাদ্দ ও মাঠ পর্যায়ে মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

আরও ১ লাখ ১০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন:

সার সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মোট ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি, ডিএপি ও ইউরিয়া সার আমদানির তিনটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে বেলারুশ থেকে ৩০ হাজার টন এমওপি, মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি এবং সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে আগস্ট মাসেও বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া এবং রাশিয়া থেকে এমওপি আমদানির প্রস্তাব ছিল।

৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল:

সার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি গঠনের পাশাপাশি ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণে কোনো অনিয়ম বা ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের সমন্বিত সার ডিলার ও বিতরণ নীতিমালার আওতায় চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় আরও সমন্বয় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

‘চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতি। শুধু সার আমদানি বা মজুত নয়, কোন এলাকায় কতটুকু সার প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কীভাবে তা কৃষকের কাছে পৌঁছানো হবে—এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সার সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে দেওয়া হবে না। কোথাও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘কৃষকের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বাসসকে বলেন, কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার নিশ্চিত করতে সরকার শুরু থেকেই আগাম ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে জেলাভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অক্টোবর মাসের জন্য টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদার বিপরীতে শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে সার নিয়ে কৃষকের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। সচিব জানান, কিছু এলাকায় বিতরণে অনিয়মের কারণে সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। তবে সরকারের তৎপরতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া। এ জন্য আমদানি, মজুত, জেলাভিত্তিক বরাদ্দ, পরিবহন ও বিতরণ—প্রতিটি ধাপ সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সার সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন মৌসুমের আগেই চাহিদা নির্ধারণ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে কৃষককে শেষ মুহূর্তে সার সংগ্রহের জন্য বাড়তি চাপ বা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে না হয়। সরকারের এ উদ্যোগের ফলে কৃষকের আস্থা বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো সার প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর