নজিরবিহীন নিরাপত্তায় সড়কপথে রূপপুরে ইউরেনিয়াম, ডিসেম্বরেই গ্রিডে আসছে পরমাণু বিদ্যুৎ

সময়: 8:40 am - October 3, 2026 |
তালুকদার বেলাল

 সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের নতুন চালান সফলভাবে প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছে। আজ শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে বিশেষ ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে।  পাবনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) আমিনুল ইসলাম এবং ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশাদুর রহমান আসাদ গণমাধ্যমকে ইউরেনিয়ামের এই চালানটি কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যেভাবে বিমানবন্দর থেকে রূপপুরে পৌঁছাল গাড়িবহর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাশিয়া থেকে রওনা হওয়া বিশেষ ইউরেনিয়ামবাহী একটি কার্গো বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটি কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে অবতরণের পর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) শীর্ষ কর্মকর্তারা পারমাণবিক জ্বালানির এই বিশেষ চালানটি নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেন।  পরবর্তীতে আজ শনিবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে পাবনার রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয় বিশেষ এই গাড়িবহর। মোট তিনটি বিশেষায়িত লরিতে করে মূল ইউরেনিয়াম এবং অপর একটি সুরক্ষিত গাড়িতে অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ পরিবহন করা হয়। এই বহরে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশনের (রসাটম) বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী এই চালানটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে ইউরেনিয়াম বহনকারী কার্গো বিমানটি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি (এয়ারস্পেস ক্লিয়ারেন্স) না পাওয়ায় ফ্লাইটটি সাময়িকভাবে পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে কূটনৈতিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এক সপ্তাহ পর সফলভাবে চালানটি দেশে আনা হলো। ইউরেনিয়াম অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ হওয়ায় এর পরিবহনে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), পুলিশ, র‍্যাব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পুরো পথজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। হাটিকুমরুল হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ইউরেনিয়ামের কনভয়টি যখন মহাসড়ক পার হচ্ছিল, তখন নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ যান চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট লেন সম্পূর্ণ খালি রাখা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. কবির হোসেন জানান, নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি এবং প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিং (বাড়তি জ্বালানি) কাজের জন্য ৪৮টি—সব মিলিয়ে মোট ২১১টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বল পর্যায়ক্রমে দেশে আসবে। রসাটমের চুক্তি অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৯টি ফ্লাইটের মাধ্যমে বাকি সবকটি চালান সফলভাবে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের প্রাথমিক জ্বালানি দেশে এসেছিল এবং চলতি বছরের মে মাসে তা সফলভাবে পারমাণবিক চুল্লিতে (রিঅ্যাক্টর) স্থাপন করা হয়। সম্প্রতি সেফটি ভালভের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোও ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে।  সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করে বলেন, সব ধরনের প্রস্তুতি ও কারিগরি পরীক্ষা সময়মতো সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে এই মেগা প্রকল্পের, যা দেশের মোট জিডিপিতে প্রায় ২ শতাংশ অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। [
Share Now

এই বিভাগের আরও খবর