ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে ৩ হাজার ৯৩৮ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ

সময়: 8:07 am - October 4, 2026 |

মোঃ সাব্বির আহমেদ:

অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ২০২৫ সালে সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন ও স্থাপনা পরিদর্শন করে ৩ হাজার ৯৩৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬২২টি ভবনকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ, পর্যাপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির রিজার্ভার, স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার, ফায়ার ডোর, প্রশিক্ষিত জনবল ও ডেডিকেটেড ফায়ার অফিসারসহ অগ্নিনিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি স্থাপনার মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫টি সন্তোষজনক, ৩ হাজার ৩১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬৫২টি ভবনের ৪৪২টি সন্তোষজনক, ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। আবাসিক ভবনের ৪৭৩টির মধ্যে ২৬১টি সন্তোষজনক, ১৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পোশাকশিল্পের ১ হাজার ৫৩৩টি কারখানার মধ্যে ৮৫৩টি সন্তোষজনক, ৫৯২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। পোশাকশিল্পের বাইরে ৭২০টি কারখানার মধ্যে ৪৩৪টি সন্তোষজনক, ২৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৩৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ১ হাজার ৫৩টির মধ্যে ৫৪৫টি সন্তোষজনক, ৪৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ৪৮০টির মধ্যে ৩২৮টি সন্তোষজনক, ১৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৯টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৭১টি রেস্টুরেন্টের মধ্যে ৫৫৪টি সন্তোষজনক, ৩৭২টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৪৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। শপিংমল ও মার্কেটের ১ হাজার ১৭১টির মধ্যে ৭২৩টি সন্তোষজনক, ৩৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৮৪টির মধ্যে ৫৩৫টি সন্তোষজনক, ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। কেমিক্যাল গোডাউনের ৯১টির মধ্যে ১১টি সন্তোষজনক, ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৩৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ফিলিং স্টেশনের ১০১টির মধ্যে ৬৯টি সন্তোষজনক, ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ভবন পরিদর্শনের ক্ষেত্রে মূলত অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের (বিএনবিসি) আলোকে নির্ধারিত চেকলিস্টের ভিত্তিতে কোনো স্থাপনা সন্তোষজনক, ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঝুঁকি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য সিঁড়ি থাকা, সিঁড়ি ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ও বাধামুক্ত কি না এবং জরুরি মুহূর্তে নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সিঁড়িতে মালামাল রেখে চলাচলের পথ বন্ধ করাকেও সরাসরি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রয়েছে কি না, সেগুলো কার্যকর অবস্থায় আছে কি না এবং তা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়। বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত হোস পাইপ ও ফায়ার পাম্প না থাকা কিংবা দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়াও ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।পরিদর্শনের সময় ভবনের আইনগত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্সের বিষয়ও যাচাই করা হয়। ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করলে সেটিকে ঝুঁকির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজউক অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হলে সেটি ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় রাখা হয়। এ ধরনের ভবনে অতিরিক্ত তলাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিঁড়ির সহজলভ্যতা ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়।ভবনের ঝুঁকি নির্ধারণে বজ্রপাত প্রতিরোধক, ছাদের ওভারহেড পানির ট্যাংক এবং ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের ধারণক্ষমতাও দেখা হয়। অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় পাম্প হাউসে ফায়ার পাম্প, বিকল্প ডিজেল পাম্প ও জকি পাম্প থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পাম্প হাউস না থাকাকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। বহুতল ভবনে স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার ব্যবস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফায়ার ডোর এবং সিঁড়িপথ বাধামুক্ত রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও পরিদর্শনের আওতায় থাকে।

সাম্প্রতিক একাধিক মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পর দেশের ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ-সহনশীলতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শুধু অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, কার্যকর জরুরি বহির্গমন এবং দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পের পর অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এবং চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে ভবনের সার্বিক দুর্যোগ-সহনশীলতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস তাদের নীতিমালা ও আইন অনুযায়ী ভবন পরিদর্শন করে। অনেক ভবন নির্মাণের সময় অনুমোদিত নকশা ও নিয়মকানুন যথাযথভাবে মানা হয় না। আবার অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণের পরও ভবনে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় ভবনে ফায়ার হাইড্রেন্ট, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, আগুন শনাক্তকরণ সেন্সর, ফায়ার ডোর এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশের অনেক ভবনে এসব ব্যবস্থা নেই। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান আরও বলেন, অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। আগুন লাগার সময় সরঞ্জামগুলো কাজ না করলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। তাই অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি সারা বছর নিয়মিত মনিটর করা প্রয়োজন।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বাসসকে বলেন, অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে আগুন লাগলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে। তাই অবকাঠামোগত নিরাপত্তার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকেও ভবন সুরক্ষিত রাখতে হবে। তিনি বলেন, বিএনবিসি অনুসরণ করে এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে ভবন নির্মাণ করলে অগ্নিঝুঁকি কমানো সম্ভব। জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শন ও ঝুঁকি চিহ্নিতকরণের এ উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রমের বিষয় নয়; বরং নির্মাণ, অনুমোদন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি বহির্গমন—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর