নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ সমূহ ও উত্তরনের উপায়’:বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-প্রাসঙ্গিক ভাবনা
নিজাম উদ্দিন দরবেশ
“Adequate Housing for All” (সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন)- এই প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রতিবারের ন্যায় আগামী ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। কিন্তু একজন দ্বায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে আমার দৃষ্টিতে এই প্রতিপাদ্য কেবল আক্ষরিক অনুবাদে সীমাবদ্ধ নয়। সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন মানে নতুন করে কৃষি জমি অথবা জলাশয় ভরাট করে কনক্রীটের ভবন তৈরী নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা প্রনয়ন ও নীতিমালা প্রস্তুত করে বিদ্যমান কাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার করে সকলের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা। আবাসন সংকট সমাধানে দেশীয় সীমিত সম্পদে বিস্ফোরনম্মুখ জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি বৈশ্বিক সংকটের কারনেও নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্য অন্যতম দুটি হলোঃ
(১) বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায়, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। যার দরুন আকস্মিক বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙ্গন, লবনাক্ততা বৃদ্ধি ও সর্বোপরি দক্ষিণাঞ্চল বিপদজনকভাবে তলিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগজনকহারে উদ্বাস্তু লোক জন মহানগর অভিমুখী হচ্ছে। যারা নগরে বাস করে মিথোস্ক্রিয়ায় সক্রিয় থেকেও নগর পরিকল্পনার বাহিরে থেকে যাচ্ছে। অথচ কার্বন ফ্রুট প্রিন্ট খুব কম থাকার পরেও বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। শিল্পোন্নত দেশ গুলোর অতিমাত্রায় জীবাশ্ম জালানি ব্যবহারের কুফল হিসাবে বিনা দোষে কেবল ভৌগলিক অবস্থানের কারনেই বাংলাদেশের জলবায়ূ উদ্বাস্তু একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দিনেদিনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিনত হয়েছে। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক আসরে কার্বন ক্রেডিট দাবী করা।
(২) শরণার্থী সমস্যাঃযুদ্ধ কিংবা জাতিগত নিধন অথবা রাষ্ট্র যখন কোন জাতি-গোষ্টীকে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার করে তখন আন্তর্জাতিক শরণার্থী সমস্যার উদ্ভব হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন , লেবানন, সিরিয়া ও আফ্রিকার কিছু আরব দেশে গৃহ যুদ্ধের কারনে বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু সমস্যা বেড়েছে। মিয়ানমারে সংখ্যা লঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জন গোষ্ঠীর উপর জাতিগত নিধনের ফলে বাংলাদেশে প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রয় নিয়েছে। ফলে কক্সবাজারের কুতুপালং ও নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে তাদের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র আয়তনের জনবহুল দেশে তা পরিবেশ-প্রতিবেশ ও অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে বৈশ্বিক পরাশক্তি দেশ গুলোর সাথে আলোচনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ প্রতাবর্তনে প্রচেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে।
অভ্যন্তরীন চ্যালঞ্জ বলতে আমার কাছে মনে হয়, নগর পরিকল্পনায় সঠিক কারিগরিজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের অবদান রাখতে না পারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকল্প গুলোকে লাভজনক দেখাতে গিয়ে কেবল ফ্ল্যাট নির্মানকেই আবাসিক সুবিধ বৃদ্ধির ধারনাকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা হয়েছে। আরো একটা বড় সমস্যা হচ্ছে সমন্বিতভাবে চিন্তা না করে ছোট ছোট কলোনী বা কম্পাঊন্ডের কথা চিন্তা করা। কিন্তু তাতে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সঠিক ভাবে করা হয় না, হলেও তা ফরমায়েশি আগেই পজিটিভ রেজাল্ট ঠিক করে দেয়া হয়। ফলে তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকশই নগর উন্নয়ন হয়না। মানসিক ও শারীরিক বিকাশে পার্ক বা উদ্যান থাকতেই হবে। বিশেষত ঢাকার মতো মেগা সিটিতে রেস্তোরা ছাড়া দুই-তিন জন বসে কথা বলার কোন জায়গায়ই নেই। টাকা খরচ না করে নগর বাসীর সুস্থ বিনোদনের (রমনা পার্ক, হাতির ঝিল এমন দুয়েকটি ব্যতীক্রম ছাড়া) কোন জায়গাই নেই।অথচ একটি আদর্শ নগর পরিকল্পনার বৈশ্বিক মানদণ্ড এবং জাতিসংঘের UN-Habitat গাইডলাইন অনুযায়ী, একটি শহরের মোট আয়তনের অন্তত ১০% থেকে ১৫% অংশ পার্ক ও সবুজ বলয় (Green Space) এবং ১৫% থেকে ২০% অংশ উন্মুক্ত পাবলিক স্পেস থাকা জরুরি।শুধু পার্ক থাকলেই হবে না, তা যেন নাগরিকদের নাগালের মধ্যে থাকে। আদর্শ নিয়ম অনুযায়ী, শহরের যেকোনো প্রান্তের মানুষের বাড়ি থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে (অথবা ৫ থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে) অন্তত একটি ছোট পার্ক বা খেলার মাঠ থাকতে হবে। নগরে ভারসাম্য বজায় রাখতে পার্কগুলোকে সাধারণত ৩টি স্তরে বিন্যস্ত করা হয়:
নেইবারহুড বা স্থানীয় পার্ক: প্রতি ২-৫ হাজার মানুষের জন্য ছোট আকারের পার্ক ও খেলার মাঠ (০.৫ থেকে ২ একর)।
আঞ্চলিক বা এলাকাভিত্তিক পার্ক: পুরো একটি জোনের মানুষের বিনোদনের জন্য মাঝারি আকারের পার্ক (৫ থেকে ১০ একর)।
সেন্ট্রাল বা বড় নগর পার্ক: পুরো শহরের ফুসফুস হিসেবে কাজ করার জন্য বিশাল আকৃতির কেন্দ্রীয় পার্ক ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO): সুস্থ জীবনযাপনের জন্য একজন নগরবাসীর জন্য ন্যূনতম ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত সবুজ স্থান থাকা আবশ্যক। তবে আদর্শ মানদণ্ড ধরা হয় প্রতি নাগরিকের জন্য ৫০ বর্গমিটার সবুজ স্থান। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক মান দন্ড থেকে যোজন যোজন দূরে রয়েছে। এই মান দন্ড হয়তো অর্জন করাও সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে বিজ্ঞান সম্মত একটা নিজস্ব মানদন্ড ঠিক করা এবং তা নিশ্চিত করার।
একইভাবে উন্নয়নের নামে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়েই ইচ্ছেমতো জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে। একটি আদর্শ ও পরিবেশবান্ধব নগরের মোট আয়তনের ১০% থেকে ১৫% অংশ জলাভুমি বা ওয়াটারবডি থাকা জরুরি। বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: শহরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা কমিয়ে জলবায়ু শীতল রাখে (হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট কমায়), জীববৈচিত্র্য রক্ষা: শহরের পাখি, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নিশ্চিত করনে জলাভূমি সংরক্ষনে আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখতে চাই। প্রয়োজনে অবৈধ ভাবে দখল কৃত খাল, বিল, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয় পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে।
কেবক মাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়ন বা আবাসন পরিকল্পনা গ্রহন কখনই টেকশই উন্নয়ন হতে পারেনা। ঢাকার আশে পাশে আর কৃষি জমি দখল করে সরকারি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প হলে তা অযথা জমির উচ্চমূল্যের কারন হবে। বরং আটটি বিভাগীয় শহর সহ পুরাতন বড় শহর যেখানে আগে থেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত সেসব শহরে সঠিক আবাসন নীতিমালা করে দিলে রাজধানীর উপর চাপ কমবে এবং মানুষের রাজধানী মুখী হওয়ার প্রবনতা কমবে। আবাসিক এলাকায় বিশ্ব-বিদ্যালয় থাকা উচিত নয়, বিশ্ব বিদ্যালয় হবে একটি সায়াত্বশাসিত ও পূর্নাঙ্গ ক্যাম্পাস। অর্থাৎ এর শিক্ষার্থী -শিক্ষক -স্টাফ সবাই এই ক্যাম্পাসের ভিতরেই থাকবেন। বিশেষ প্রয়োজনেই কেবল শহরে যাবেন। তা না করে ব্যক্তি স্বার্থে আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে যত্র তত্র বিস্ব-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে দিয়ে ট্রাফিক জ্যাম অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোন প্রকার চাহিদা যাচাই না করে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো শপিং সেন্টার গজিয়ে উঠেছে। অধিকাংশ সারা বছর ক্রেতা শূন্য পড়ে থাকে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকার চরিত্র বদলে ফেলায় সেটেলাইট টাউনশীপ ধারনা কার্যকর হচ্ছেনা। ট্রাফিক জ্যাম এ পড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মন সিংহ নগরীগুলো কার্যত গতিহীন হয়ে পড়েছে। আবাসন খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।আবাসন খাতে বেসরকারি খাত এর বিকাশে নীতিমালা ব্যবসা বান্ধব এবং ওয়ান্সটপ সার্ভিস এর মাধ্যমে সেবা সহজী করন করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ভূমি উন্নয়ন, প্লট-ফ্ল্যাটের ব্যবসা করুক তা কারও কাম্য নয়। সরকার বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক নীতিমালা করবে, সরকারি প্রতিষ্ঠান সেসব নীতিমালা বাস্তবায়ন, তদারকি করবে এটাই কাম্য। অর্থাৎ সবার জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতে রাস্ট্রের ভূমিকা হবে মনিটরিং অথরিটির, নিজে ব্যবিসায়ী বনে যাওয়া নয়। জনগনের করের টাকায় তিন গুন ক্ষতি পূরন দিয়ে আর এক বর্গ ইঞ্চি কৃষি জমিও অধিগ্রহন দেখতে চাইনা। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে হলে কৃষি জমি, জলাধার সংরক্ষণ ও একটি নির্ভূল ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। আসলে সঠিক ডেটা বেইজ না থাকলে ভবিষ্যত চাহিদা নিরূপন ও সঠিক পরিকল্পনা প্রনয়ন সম্ভবনয়। তাই যেকোন পরিকল্পনা নেয়ার আগে দরকার একটি সঠিক ডেটা বেইজ তৈরী করা।
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক মানব কথা

















