বাংলাদেশ-চীন সমঝোতা: দেশে হবে যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সময়: 10:35 am - October 17, 2026 |

মানব কথা ডেস্ক:

বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের আটটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন, যৌথ উদ্যোগে একটি কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং ২+২ ও ৩+১ মডেলের কারিগরি শিক্ষাক্রম চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ‘ফ্রেমওয়ার্ক অব ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন স্ট্যান্ডার্ডস’ বা ‘বেইজিং এগ্রিমেন্ট’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে এসব উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বৈশ্বিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মানদণ্ডবিষয়ক কাঠামোর সমর্থনকারী দেশগুলোর অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের যৌথ স্বাক্ষর পর্বে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং চীনের শিক্ষা উপমন্ত্রী ওয়াং গুয়াংইয়ান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। সম্মেলনে ৪০টিরও বেশি দেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং শতাধিক দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। বেইজিং এগ্রিমেন্ট ছাড়াও সম্মেলনে ‘চীনে বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ক শ্বেতপত্র’, ‘লুবান ওয়ার্কশপের জাতীয় মানদণ্ড’ এবং আন্তর্জাতিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) সহযোগিতা এগিয়ে নিতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ করা হয়।

স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাংলাদেশ ও চীন ছয়টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করবে। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. আটটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন: চীনের কারিগরি শিক্ষাক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশের আটটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

২. যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে একটি নতুন কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

৩. যৌথ শিক্ষাক্রম চালু: কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য ২+২ ও ৩+১ মডেলের যৌথ একাডেমিক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব মডেলের মাধ্যমে দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

৪. আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা: বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম ও স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

৫. চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান: চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি কারিগরি শিক্ষার্থীদের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।

৬. বৃত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাসংক্রান্ত বৃত্তির সুযোগ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চুক্তি বাস্তবায়নে চীনের গুয়াংডং, জিয়াংসি ও অন্যান্য প্রদেশের খ্যাতনামা কারিগরি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার প্রধান বাস্তবায়নকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।

বেইজিং এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মানদণ্ড গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এ কাঠামোর প্রতি সমর্থন ও সম্পৃক্ততা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবর্তনশীল কর্মবাজারে টিকে থাকতে কারিগরি দক্ষতার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে যৌথ শিক্ষাক্রম, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মসংস্থানের উদ্যোগ বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘এই সমঝোতা স্মারক এবং বেইজিং এগ্রিমেন্ট একত্রে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করবে।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘বৈশ্বিক কারিগরি শিক্ষার মানদণ্ড এবং বাস্তবধর্মী দ্বিপক্ষীয় যৌথ সহযোগিতা বাংলাদেশি তরুণদের জন্য বিশ্বজুড়ে বাস্তব কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।’ সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে বলে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রত্যাশা, এ সহযোগিতা মানবসম্পদ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নেও অবদান রাখবে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাস্তবে কতটা সম্প্রসারিত হয় তার ওপর।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর