নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র আইন ও জাতীয় রোড সেফটি রোডম্যাপ চায় নিসচা

সময়: 10:28 am - October 1, 2026 |

মানব কথা ডেস্ক:

আগামী ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে অক্টোবরজুড়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে আনতে একটি স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, জাতীয় রোড সেফটি রোডম্যাপ এবং সমন্বিত রোড ক্র্যাশ ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিসচার মহাসচিব লিটন এরশাদ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। কানাডা থেকে ভার্চুয়ালি এতে যুক্ত হন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব এম নাহিদ মিয়া। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কমিটির আহ্বায়ক এম কাইয়ুম খান।

স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইনের দাবি

নিসচার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় বলেন, ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; মানুষের জীবন রক্ষায় জাতীয় অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। তিনি বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবি কোনো একক সংগঠনের দাবি নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়। সড়ক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কাঠামোর আওতায় আনতে একটি স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অনিরাপদ যানবাহন, মানসম্মত হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং পথচারীদের নিরাপত্তার ঘাটতিসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

‘সড়ক দুর্ঘটনা নয়, রোড ক্র্যাশ’

সংবাদ সম্মেলনে নিসচার পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রচলিত ধারণা নিয়েও আলোচনা করা হয়। সংগঠনটির মতে, আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ‘Road Crash’ বা ‘Road Traffic Crash’ ধারণাটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিসচা বলছে, ‘Accident’ শব্দটি অনেক সময় ঘটনাটিকে অনিবার্য হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ‘Crash’ শব্দটি সংঘর্ষের পেছনে থাকা ঝুঁকি, ব্যবস্থাগত দুর্বলতা এবং ভবিষ্যতে তা প্রতিরোধের সুযোগকে সামনে আনে। সংগঠনটির মতে, সড়কে প্রাণহানি ঘটলে শুধু চালকের ভুল খুঁজে সমাধান করা যথেষ্ট নয়। সংঘর্ষ কেন ঘটেছে, সড়ক ও যানবাহনে কী ধরনের ঝুঁকি ছিল, চালক বা পথচারীর ভুলের পেছনে ব্যবস্থাগত কোনো কারণ ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

জাতীয় রোড সেফটি রোডম্যাপের দাবি:

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিসচার পক্ষ থেকে একটি National Road Safety Road Map প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, এই রোডম্যাপে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত সময়সীমা, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের সুস্পষ্ট কাঠামো থাকতে হবে। একই সঙ্গে একটি সমন্বিত National Road Crash Data Management System গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিসচার মতে, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ, নীতিনির্ধারণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ কঠিন। প্রযুক্তিনির্ভর Smart Road Safety Management System চালুর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্তকরণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, ক্র্যাশ বিশ্লেষণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের ফলাফল পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও দাবি জানানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা জোরদারের দাবি:

সড়ক দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি চিকিৎসা, ট্রমা কেয়ার, পুলিশি সহায়তা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে নিসচা। সংগঠনটির মতে, সড়কে মৃত্যু অনিবার্য নয়। পরিকল্পিত ‘সেফ সিস্টেম’, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার, দক্ষ চালক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, কার্যকর আইন ও আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং দ্রুত ‘Post-Crash Response’ নিশ্চিত করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব। এ জন্য সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা ও জরুরি সেবা, গণমাধ্যম, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

সড়ক নিরাপত্তা কমিটি পুনর্গঠনকে স্বাগত:

লিখিত বক্তব্যে নিসচার মহাসচিব লিটন এরশাদ বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ জেলা, মেট্রোপলিটন ও উপজেলা পর্যায়ের সড়ক নিরাপত্তা কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে। নিসচা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সমন্বয় আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিক সমাজ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ১৫ দফা প্রস্তাব নিয়ে বৈঠক:

নিসচা জানিয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনের একটি প্রতিনিধি দল সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাতে সড়ক, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন দ্রুত প্রণয়নসহ ১৫ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে নিসচার প্রতিনিধিত্ব, সরকারি সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সংগঠনটিকে সম্পৃক্ত করা, মহাসড়কে Emergency Response Unit, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রমা সেন্টার এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি Road Safety Road Map প্রণয়নের বিষয় রয়েছে। নিসচার দাবি, প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারও আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন।

অক্টোবরজুড়ে ১ হাজার কর্মসূচি:

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে অক্টোবর মাসজুড়ে প্রায় ১ হাজার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিসচা। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—বিদ্যমান চালকদের দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন জানা ও মানার বিষয়ে রোড ক্যাম্পেইন, বৃক্ষরোপণ, সংবাদ সম্মেলন, র‌্যালি, পোস্টার প্রকাশ, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ এবং সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয়। এ ছাড়া অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে সতর্কতামূলক সাইন স্থাপন, বিপজ্জনক বাঁকে সচেতনতামূলক রোড সাইন স্থাপন, মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হেলমেট বিতরণ, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বয়সভিত্তিক রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং বাস ও ট্রাক টার্মিনালে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে।

২২ অক্টোবর থাকবে বিশেষ কর্মসূচি:

নিসচার কেন্দ্রীয় কর্মসূচির তালিকা অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি মরহুমা জাহানারা কাঞ্চনের কবর জিয়ারত ও দোয়া, র‌্যালি এবং মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এদিন বিকেল ৪টায় কাকরাইল থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত র‌্যালি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাদ মাগরিব নিসচা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হবে। এর আগে ৪ ও ৮ অক্টোবর কাকরাইল মোড়ে, ১১ অক্টোবর মৌচাক মোড়ে, ১৩ অক্টোবর তাঁতীবাজার মোড়ে এবং ১৫ অক্টোবর মহাখালী বাস টার্মিনালে রোড ক্যাম্পেইন আয়োজনের কর্মসূচি রয়েছে। ১৮ বা ১৯ অক্টোবর গাবতলী বাস টার্মিনালে রোড ক্যাম্পেইন এবং ২০ বা ২১ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে গোলটেবিল বৈঠকের পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট’ চায় নিসচা:

নিসচা জানিয়েছে, জনসচেতনতার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায় থেকে শিক্ষার মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার ধারণা ছড়িয়ে দিতে হবে। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশনমূলক কর্মশালা পরিচালনা করে আসছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কাউট, গার্লস গাইড, কাব ও রোভার স্কাউটের আদলে স্বতন্ত্র ‘সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট’ গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

১২৩ শাখায় আরও ১ হাজার কর্মসূচি:

নিসচার কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি দেশের ১২৩টি শাখা সংগঠনও অক্টোবর মাসে প্রায় ১ হাজার কর্মসূচি পালন করবে বলে জানানো হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসের কর্মসূচি শেষ হলেও সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম থেমে থাকবে না। সড়কে একটি প্রাণহানি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং বহু মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে। তাই সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু পরিবহন খাতের বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে নিসচা। এবারের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। মাসব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে সড়ক ব্যবহারকারী, চালক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সড়ক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে জনআলোচনা তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সংগঠনটি।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর