সওজের ৪ শতাধিক স্থাপনায় বসছে সৌর প্যানেল, উৎপাদন হবে ৫ হাজার ১৪৪ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ
মানব কথা ডেস্ক:
সরকারি স্থাপনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) চার শতাধিক স্থাপনার ছাদ ও অব্যবহৃত জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব স্থানে মোট ৫ হাজার ১৪৪ কিলোওয়াট (৫.১৪৪ মেগাওয়াট) সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে অধিদপ্তর। একই সঙ্গে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও এ উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে। সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অধিদপ্তরের বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও অব্যবহৃত জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চার অর্থবছরে স্থাপিত হবে ৫.১৪৪ মেগাওয়াট সক্ষমতা:
সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হবে। অর্থবছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা হলো—
- ২০২৬-২৭ অর্থবছর: ১ হাজার ২৪৪ কিলোওয়াট
- ২০২৭-২৮ অর্থবছর: ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট
- ২০২৮-২৯ অর্থবছর: ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট
- ২০২৯-৩০ অর্থবছর: ১ হাজার ৫০০ কিলোওয়াট
চার অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার ১৪৪ কিলোওয়াট বা ৫.১৪৪ মেগাওয়াট।
অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে সওজের বিভিন্ন স্থাপনায় ৪১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। প্রধান প্রকৌশলী জানান, চলতি অর্থবছরে ২৮৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে দরপত্র আহ্বায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৯৬০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
ছাদ ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা:
সওজের এ উদ্যোগের আওতায় অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়, প্রকৌশল স্থাপনা ও অন্যান্য ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসানো হবে। পাশাপাশি অব্যবহৃত খালি জায়গাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব জায়গায় মেগাওয়াট-স্কেলের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে নতুন করে জমি ব্যবহারের প্রয়োজন ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে ব্যবহার করা গেলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়বে। তিনি আরও বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অধিদপ্তরের যেসব স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্ব:
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ বাসসকে বলেন, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো ২০৫০ সালের নেট-জিরো জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবে। এ ক্ষেত্রে সওজের ভূমিকা প্রশংসনীয়। স্রেডার প্রকাশিত নীতিগত তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সওজের মতো বড় সরকারি অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ভবন ও অব্যবহৃত জায়গাকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সওজের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ে নিজস্ব ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ বাড়বে। এতে দিনের বেলায় কার্যালয়ের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়েও সহায়তা মিলতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদিত বিদ্যুতের যথাযথ ব্যবহার এবং গ্রিডের সঙ্গে সংযোগব্যবস্থার ওপর। কোন স্থাপনায় কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, উৎপাদিত বিদ্যুতের কতটুকু নিজস্ব ব্যবহারে যাচ্ছে এবং এর ফলে কত টাকা সাশ্রয় হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিরূপণ সহজ হবে। সব মিলিয়ে, আগামী চার অর্থবছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অব্যবহৃত জমিতে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের পরিধি বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সওজের অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।









