পদ্মায় ইলিশ শিকার বন্ধ হচ্ছে না, দোহারে সিন্ডিকেটের দাপটের অভিযোগ
দোহার প্রতিনিধি:
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের অভিযান উপেক্ষা করেই ঢাকার দোহার উপজেলার পদ্মা নদীতে চলছে ইলিশ শিকার। নদীতীরবর্তী অন্তত ১২টি বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা ইলিশ। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা কম দামে মাছ পাওয়ায় এসব বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনাও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইলিশ শিকার, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে একাধিক সিন্ডিকেট জড়িত। তাদের প্রভাবের কারণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দোহারের বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকা ও বাজারে ছোট ও মাঝারি আকারের ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, বড় আকারের ইলিশ তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর বেশি দামে বিক্রির আশায় বড় মাছের একটি অংশ মজুত করা হচ্ছে বলেও ধারণা তাঁদের। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দোহারের বাঘড়া, নন্দলালপুর চর, মুকসুদপুর, নারিশা বাজার, মেঘুলা ঘাট, সুতারপাড়া-মধুরচর, মাহমুদপুর, বিলাশপুর ও মৈনটঘাটসহ পদ্মার তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। মধুরচরের বাসিন্দা আনিস মিয়া ও রহমান বেপারী জানান, নদীর পাড়ে জেলেদের নৌকা থেকে প্রকাশ্যেই ইলিশ বিক্রি হতে দেখেছেন তাঁরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার টাকায়। ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ছিল প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর চেয়ে ছোট আকারের ইলিশ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি প্রায় ৯০০ টাকায়। স্থানীয়দের দাবি, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এসব মাছের দাম কিছুটা কম। স্থানীয় বাজার থেকে মাছ কিনে খুচরা বিক্রেতারা দূরের বাজারে কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আড়তদার ও বরফকলের মালিকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় প্রশাসন ও কুতুবপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক কে এম নজরুল ইসলাম জানান, ইলিশ শিকার ও কেনাবেচার সঙ্গে কিছু স্থানীয় সিন্ডিকেট জড়িত। বিস্তীর্ণ নদী এলাকায় সীমিত জনবল নিয়ে সার্বক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। তিনি বলেন, সরকারি ইঞ্জিনচালিত নৌকা দেখলেই জেলেরা ছোট খালে ঢুকে পড়েন। এতে তাঁদের শনাক্ত ও আটক করা কঠিন হয়ে যায়। দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, উপজেলা প্রশাসন সিন্ডিকেটের মধ্যস্থতাকারীদের তালিকা তৈরি করে দিলে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। অন্যদিকে, দোহার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শিরিন সুলতানা মুন্নী বলেন, তাঁদের দপ্তরে জনবল মাত্র তিনজন। এ পরিস্থিতিতে নৌ-পুলিশের সহযোগিতার ওপরই মূলত নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে সিন্ডিকেটের মধ্যস্থতাকারীদের নাম জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশে জব্দ করা জাল নদীর পাড়ে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত ২০ জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দোহার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নওশীনা আরিফ নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকার এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বাজারগুলোতে খুব ভোরে, ফজরের আজানের সময় এবং রাতে ইলিশ বিক্রির খবর তাঁরা পেয়েছেন। নওশীনা আরিফ বলেন, রাতের অন্ধকারে উত্তাল নদীতে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। তারপরও অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযানে উদ্ধার করা কিছু ইলিশ এতিমখানায় দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান ও জাল জব্দের পরও নদীতে ইলিশ শিকার এবং বাজারে বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাঁদের মতে, শুধু জেলেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই হবে না; অবৈধ মাছের কেনাবেচা, পরিবহন ও মজুতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে। নদীতীরবর্তী বাজারগুলোতে নিয়মিত নজরদারি এবং অবৈধ মাছের বেচাকেনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।









