না ফেরার দেশে সোনালী যুগের নায়ক ইলিয়াস জাভেদ
মানব কথা: দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের জনপ্রিয় অভিনেতা ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ আর নেই। আজ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৮২ বছর।
তার মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য সনি রহমান। তিনি বলেন, “জাভেদ ভাই দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। আজ চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সবাই তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করবেন।”
দীর্ঘ ১৩ বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে হাজির বালাম
ইলিয়াস জাভেদের মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মী শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও অসংখ্য ভক্ত এই গুণী শিল্পীর প্রয়াণে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছেন।
পারিবারিক নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। চলচ্চিত্রে তিনি ‘জাভেদ’ নামেই পরিচিত ছিলেন। জন্মস্থান ও জন্মসাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা থাকলেও জানা যায়, শৈশব থেকেই নাচ ও অভিনয়ের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। মুম্বাই থেকে নৃত্যের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। তবে রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে এই শিল্পচর্চা ছিল পরিবারবিরোধী।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৬৩ সালে পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তিনি পাঞ্জাব ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসেন নাচের দলের সঙ্গে। ঢাকায় এসে সিদ্দিকবাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
১৯৬৪ সালে কায়সার পাশা পরিচালিত উর্দু ছবি ‘মালান’-এ প্রথম নৃত্য পরিচালনা করেন ইলিয়াস জাভেদ। এরপর সত্তর ও আশির দশকে তিনি প্রায় শতাধিক ছবিতে নৃত্য পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সে সময় বাংলাদেশের অনেক নামকরা নায়ক-নায়িকাকে নাচের প্রশিক্ষণ দেন তিনি।
অভিনয়ে তার যাত্রা শুরু হয় উর্দু ভাষার ছবি ‘নেহি জিন্দেগি’ দিয়ে, যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উর্দু ছবি ‘পায়েল’ (বাংলায় ডাবিং: ‘নুপুর’) ছিল তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। পরবর্তীতে নায়ক হিসেবে শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
তার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে ১৯৭৮ সালে ববিতা অভিনীত ‘নিশান’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই ছবিটি তার ক্যারিয়ারের সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত হলেও তিনি কখনো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি—যা ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় আক্ষেপ।
সমসাময়িক অনেক নায়িকার সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করলেও অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে তার জুটি ছিল সুপার ডুপার হিট। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীকে বিয়ে করেন। দীর্ঘ চার দশকের দাম্পত্য জীবন পার করলেও এই দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন।
‘পায়েল’, ‘নিশান’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘সওদাগর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘মালকাবানু’, ‘নরমগরম’, ‘কাজলরেখা’, ‘চোরের রাজা’, ‘রাজবধূ’, ‘আলিবাবা চল্লিশ চোর’, ‘হীরনপাশা’, ‘জীবনসঙ্গী’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তার অভিনয় বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ অভিনয় ও নৃত্য পরিচালনার জীবনে অসামান্য অবদান রেখেও জীবদ্দশায় তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। ইলিয়াস জাভেদের মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

















