বিদ্যুতে শহর-গ্রামের বৈষম্য চরমে, রাজধানীতে স্বস্তি, পল্লীতে দীর্ঘ লোডশেডিং
মানব কথা: দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রকট বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতির দিনেও রাজধানী ঢাকায় লোডশেডিং না থাকলেও দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, কয়েকটি জেলায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং বিদ্যুৎ অফিসে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার মধ্যরাতে দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৭৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৯৮ মেগাওয়াট, ফলে সারা দেশে ৩ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। তবে ওই দিন রাজধানী ঢাকায় কোনো লোডশেডিং হয়নি।ডেসকো তাদের ১ হাজার ২৮৪ মেগাওয়াট এবং ডিপিডিসি ১ হাজার ৮২১ মেগাওয়াট চাহিদার শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। বিপরীতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ২ হাজার ৮৬৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করেছে মাত্র ২ হাজার ৩৯৮ মেগাওয়াট। ফলে শুধু ঢাকার আশপাশের পল্লী এলাকাতেই ৪৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করেছে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরের বাইরের এলাকাগুলোতেও।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও রংপুরের বিভাগীয় শহরগুলোতে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ।বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকরা সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। জামালপুরের মাদারগঞ্জে কয়েকশ মানুষ বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।মাদারগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপজেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়েই দীর্ঘ সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অলস:
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে মাত্র সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র বিভিন্ন কারণে অলস পড়ে রয়েছে।বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ১২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একইভাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ রয়েছে কয়লার অভাবে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস থাকলেও সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এক অর্থবছরে এ খাতে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকট, গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ নীতির কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতীতের নীতিগত ভুলের প্রভাব এখনও বহন করতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিকের আশ্বাস:
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ফলে কিছু এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোববার পরিস্থিতি খারাপ থাকলেও সোমবার থেকে উন্নতি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।”








