আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ার আহ্বান নৌমন্ত্রীর

সময়: 9:26 am - September 27, 2026 |

 শহিদুল ইসলাম:

নীতি, পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রকৃত সাফল্য কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, শুধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসমর্থন বা আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিরাপদ জাহাজ, আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন বন্দর, দক্ষ নাবিক, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং টেকসই নৌবাণিজ্যের মাধ্যমে এসব উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে হবে।রোববার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্ব নৌ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, দেশের বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন, অটোমেশন ও সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন সক্ষমতা বাড়ানো এবং ফ্ল্যাগ স্টেট ও পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। তিনি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান কার্যকরভাবে প্রতিপালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও উপকূলীয় নৌপরিবহনের টেকসই উন্নয়ন, নদীদূষণ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। শেখ রবিউল আলম বলেন, বাংলাদেশের নাবিকেরা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সামুদ্রিক সম্পদ এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তাদের কল্যাণ, প্রশিক্ষণ, সনদায়ন ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল খন্দকার মেসবাহ-উল-আজিম সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সমৃদ্ধির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বন্দর, নৌবাণিজ্য, মৎস্যসম্পদ, অফশোর সম্পদ ও ব্লু ইকোনমির বিকাশ একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা, তথ্য বিনিময়, মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের আহ্বান জানান নৌবাহিনী প্রধান। তিনি বাংলাদেশের নৌ-ঐতিহ্য, দেশীয় নৌযান নির্মাণের দক্ষতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকদের অবদানের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মেরিটাইম শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। নারী মেরিটাইম পেশাজীবীদের অংশগ্রহণকে সামুদ্রিক খাতের উৎকর্ষ অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে প্রায় ৪০ লাখ টিইইউ অতিরিক্ত সক্ষমতার চাহিদা মোকাবিলায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।২০২৯ সালে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রায় ২৩০ মিটার দীর্ঘ এবং ৮ থেকে ১০ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মাদার ভেসেল সরাসরি গ্রহণ করতে পারবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। এর ফলে পরিবহন সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ নৌপথকে অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় নৌপথ ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমন্বিত মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, Hong Kong International Convention কার্যকর হওয়ার পর দেশের ২৪টি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ইয়ার্ড কমপ্লায়েন্স অর্জন করেছে। আরও ২০টি ইয়ার্ড সনদায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। নিরাপত্তা, শ্রমিককল্যাণ ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে এ শিল্পকে আধুনিক, দায়িত্বশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, তেল ও বাংকার দূষণজনিত ক্ষতিপূরণ এবং জাহাজের ধ্বংসাবশেষ অপসারণসংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কনভেনশনে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনে এটি দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি জাতীয় আইন, বিধিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার GreenVoyage2050 কর্মসূচির সহায়তায় জাহাজ চলাচল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।কম-কার্বন জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, বন্দর কার্যক্রমের বিদ্যুতায়ন এবং পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সবুজ নৌপরিবহনে উত্তরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অগ্রগতি তুলে ধরে জানানো হয়, বর্তমানে ১৫টি মেরিটাইম একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষ নাবিক, মেরিন প্রকৌশলী ও বন্দর ব্যবস্থাপনা পেশাজীবী তৈরিতে কাজ করছে। ২০১৪ সাল থেকে ১৩৮ জনের বেশি নারী ক্যাডেট দেশের মেরিটাইম একাডেমিগুলো থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৫০ জন নারী ক্যাডেট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করছেন। সামুদ্রিক দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম, জাহাজ শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের Joint Rescue and Coordination Centre (JRCC)-এর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর কথা জানানো হয়।

একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌযানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল নিবন্ধন ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, সরকার, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, জাহাজমালিক, শিপিং কোম্পানি, জাহাজ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী, মেরিটাইম একাডেমি, নাবিক এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশ্ব নৌ দিবস-২০২৬-এর মূল আহ্বান হিসেবে নীতিকে কার্যক্রমে রূপান্তর, অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য অর্জনে পরিণত এবং সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে জাতীয় সুফলে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

‘নীতি থেকে বাস্তব প্রয়োগ: নৌ খাতে উৎকর্ষতা অর্জন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নৌপরিবহন অধিদপ্তর আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিরাপদ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতাসক্ষম সামুদ্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, জাহাজমালিক, শিপিং কোম্পানি, জাহাজ ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, মেরিটাইম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, নাবিক, সামুদ্রিক পেশাজীবী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর