সালমান এফ রহমানসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা সুপারিশ

সময়: 1:43 pm - September 27, 2026 |

মানব কথা:সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন, বিতরণ ও উত্তোলনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে এ মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।দুদকের অনুসন্ধানসংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের নামে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। ঋণের বড় একটি অংশ উত্তোলনের পরও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি।দুদকের প্রধান কার্যালয়ের ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের স্মারকের ভিত্তিতে পরিচালিত অনুসন্ধানে সালমান এফ রহমান, তার ছেলে ও আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমানসহ ব্যাংকটির সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা এবং স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪ প্রতিষ্ঠানের নামে ৭ হাজার ১২৯ কোটি টাকার ঋণের অভিযোগ

দুদকের নথি অনুযায়ী, সালমান এফ রহমান ও আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই না করে জামানতবিহীন ৭ হাজার ১২৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন, বিতরণ ও উত্তোলন করে আত্মসাৎ এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে অনুসন্ধান করা হয়েছে।তবে স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ঘটনায় আলাদাভাবে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণসীমা অনুমোদন ও এর বড় অংশ উত্তোলনের বিষয়টি উঠে এসেছে।

স্কাইমার্কের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ

দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল-মনজুর এবং পরিচালক ইশরাত জাহান। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও আইএফআইসি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম করেন।নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ৯০ কোটি টাকা ওডি ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি ঋণের সীমা বাড়িয়ে ১৪৫ কোটি টাকা করা হয়।সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৫ জুন ৬৫০ শতাংশ জমি বন্ধক গ্রহণের প্রস্তাব থাকলেও বন্ধক সম্পাদন না করেই ঋণের সীমা ১৪৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪৫ কোটি টাকা করার অনুমোদন দেওয়া হয়।দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, তিন দফায় অনুমোদিত ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা নগদে ও বিভিন্নভাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে বিতরণ ও উত্তোলন করা হয়। ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করে এবং অর্থ পরিশোধ না করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি ৬০৪ কোটি টাকার বেশি

নথি অনুযায়ী, ঋণ বিতরণের পর বিভিন্ন সময়ে গ্রাহক ঋণ সুবিধা বা বর্ধিত ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে জমা করা ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬০ টাকা বাদ দেওয়া হয়েছে।এর সঙ্গে সুদ ও অন্যান্য চার্জ বাবদ ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ ৪০ হাজার ৯৯৪ টাকা ৩ পয়সা যোগ হয়ে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই ভিত্তিক ওডি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৬০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৬ টাকা ৩ পয়সা। দুদকের নথিতে এটিকে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ

দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের প্রকৃতি, উৎস ও গন্তব্য আড়াল করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ নগদে উত্তোলন করে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করা হয়েছে।রেকর্ডপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ অনুমোদনে বিধি অনুসরণ না করার অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন, ঋণের যথাযথ ব্যবহারসংক্রান্ত নির্দেশনা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সিআরএম পলিসি-২০১৭-এর বিধান অনুসরণ করা হয়নি।অভিযোগে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত জামানত না থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গোডাউন পরিদর্শন, উদ্যোক্তা পরিচালকদের কেওয়াইসি ও পরিচয় যাচাই, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, মূলধন, আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদ ও দায়, অডিটেড ব্যালান্সশিট, আয়কর পরিশোধ, ঋণের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং পূর্বের ঋণের ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।

যাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ

মামলার সুপারিশ করা ২৪ জনের মধ্যে রয়েছেন—

  • সালমান ফজলুর রহমান

  • আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমান

  • স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল-মনজুর

  • পরিচালক ইশরাত জাহান

  • আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক পরিচালক সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

  • শাহ মনজুরুল হক

  • এ আর এম নজমুস ছাকিব

  • কামরুন নাহার আহমেদ

  • মো. গোলাম মোস্তফা

  • মো. জাফর ইকবাল

  • রাবেয়া জামালী

  • তৎকালীন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ক্রেডিট কমিটির সদস্য সৈয়দ মনসুর মোস্তফা

  • সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম সারোয়ার

  • উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম

  • মো. নুরুল হাসনাত

  • মনিতুর রহমান

  • হেড অব ট্রেজারি মোহাম্মদ শাহিন উদ্দিন

  • হেড অব ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সৈয়দ হাসানুজ্জামান

  • সাবেক হেড অব অপারেশন হেলাল আহমেদ

  • সাবেক ডিএমডি ইকবাল পারভেজ চৌধুরী

  • শাহ মো. মঈনউদ্দিন

  • তৎকালীন চিফ ম্যানেজার হোসাইন শাহ আলী

  • মো. জুলফিকার আলী চাকদার

  • রিলেশনশিপ ম্যানেজার তাসলিমা আক্তার

  • সালমান মাহবুব

যেসব ধারায় মামলা করার সুপারিশ

দুদকের নথিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।তবে মামলা দায়ের ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি হবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর