অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড
জিয়াউল হক টুটুল:
২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কার্যকর নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের যৌথভাবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের নাম ঘোষণা করে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি কিংবা দ্রুত প্রবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর নীতিনির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা সামষ্টিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ এবং নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক মন্দার সময় সুদের হার কমানো ও সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে বাজারে চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বিপরীতে, অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো কিংবা সরকারি ব্যয় সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জন মেনার্ড কেইনসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের পর থেকে এ ধরনের স্থিতিশীলতামূলক নীতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে ১৯৭০-এর দশকে তেলসংকটের সময় প্রচলিত কেইনসীয় মডেলের কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়। ওই সময় পশ্চিমা দেশগুলো নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়। এতে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত নীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে হল ও উডফোর্ডের গবেষণা সামষ্টিক অর্থনীতির মডেলকে আরও সুসংহত তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তাঁদের গবেষণায় মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও ভোগের মতো সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের মডেলে ক্ষুদ্র অর্থনীতির নীতির সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়। ফলে মানুষ কীভাবে সঞ্চয় ও ব্যয় করে, কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে—এসব সিদ্ধান্ত সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা বিশ্লেষণ করা সহজ হয়।
হল ও উডফোর্ডের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শুধু বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তাদের প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়ে মানুষের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে ভোগ, বিনিয়োগ ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। প্রতিবেদনে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জন হাসলারের বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, হল ও উডফোর্ডের গবেষণা বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের ব্যবহৃত অর্থনৈতিক মডেলের জন্য শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে। জ্বালানির দামের আকস্মিক বৃদ্ধি কিংবা পরিবারের ভোগব্যয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের মতো অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় এসব মডেল নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করতে পারে। ২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট। উদ্ভাবন কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেয়, সে বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। মানবকল্যাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে তিনি নিজের সম্পদ এ পুরস্কারের জন্য উৎসর্গ করেন। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তি—এই পাঁচটি বিভাগে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পরে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ ও অর্থায়নে অর্থনীতিতে পুরস্কার চালু হয়। প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞ কমিটি বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার বিজয়ী নির্বাচন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার সুইডেনের স্টকহোমে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় নরওয়ের রাজধানী অসলোতে।









