প্রিপেইড মিটারে রিচার্জে ০.৫ শতাংশ ছাড়, খরচ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সুবিধা
বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে রিচার্জের অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট বা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করা এবং মাসিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে প্রিপেইড মিটারের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর রাজস্ব আদায় সহজ করা, বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং পরিচালন ব্যয় কমাতেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারে গ্রাহক নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ও অবশিষ্ট ব্যালেন্স সহজেই জানতে পারেন। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, পোস্টপেইড মিটারে সাধারণত মাস শেষে বিলের পরিমাণ জানা যায়। এতে আগে থেকে বিদ্যুৎ ব্যয়ের হিসাব রাখা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও সচেতন হতে পারেন। তবে এ ব্যবস্থার সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে মিটারের নিয়ম, চার্জ ও রিবেট সম্পর্কে গ্রাহকদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, প্রিপেইড মিটারের উল্লেখযোগ্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে অগ্রিম রাজস্ব আদায়, সিস্টেম লস কমানো, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ, লোড ব্যবস্থাপনা এবং বিলিংয়ের নির্ভুলতা বৃদ্ধি। এ ছাড়া মিটার রিডিং নেওয়া, বিল তৈরি ও বিতরণে জনবলের ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। এ ব্যবস্থায় জরুরি ব্যালেন্স এবং নির্ধারিত ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ার’ সুবিধাও পাওয়া যায়। ফলে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেও নির্দিষ্ট শর্তে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে। ভাড়াটিয়া ও সরকারি আবাসনে বিদ্যুৎ বিল ভাগাভাগি এবং পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা কমাতেও প্রিপেইড মিটার সহায়ক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রিপেইড মিটারে মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো সময় রিচার্জ করা যায়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট এবং ব্যাংকের বুথ থেকেও রিচার্জের সুযোগ রয়েছে। ব্যালেন্স কমে গেলে মিটারে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়, যা গ্রাহককে আগেভাগে রিচার্জ করার সুযোগ করে দেয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ সম্পর্কে আগেই ধারণা পাওয়া। মিটারে অবশিষ্ট টাকা দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে মাস শেষে বড় অঙ্কের বিলের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও কমে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালেহ হাসান বাসসকে বলেন, মাসের শুরুতে কত টাকা রিচার্জ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে তিনি পুরো মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। ঘরে বসেই সহজে মিটার রিচার্জ করা যায়। পাশাপাশি কত টাকা অবশিষ্ট আছে, তা জানা যায় বলে প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার বিষয়ে তিনি আরও সচেতন হয়েছেন। বগুড়া শহরের বাসিন্দা ও নেসকোর গ্রাহক মুজাহিদ শেখও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অল্প কিছুদিন আগে তার বাসায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। আগে মাস শেষে কত টাকা বিল আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকত। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারছেন। তার মতে, প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে বিদ্যুতের মূল খরচ একই হলেও সচেতনভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, প্রিপেইড সংযোগ নিতে নিরাপত্তা জামানত দিতে হয় না। তবে আবাসিক গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা মিটারের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের ভাড়া ২৫০ টাকা। সাধারণত মাসের প্রথম রিচার্জের সময় প্রযোজ্য ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয় করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক জানুয়ারিতে প্রথমবার ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা কাটা হবে। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর রিবেট যোগ হয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা থাকবে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা। সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো মাসে মিটারে ব্যালেন্স অবশিষ্ট থাকলে পরবর্তী মাসে নতুন করে রিচার্জ না করেও সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে কোনো মাসে রিচার্জ না করলে ওই মাসের এবং আগের মাসগুলোর প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হয়। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ ও বিভিন্ন সমস্যা কমাতে এবং এ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, উদাহরণস্বরূপ, ডেসকোর অ্যাপে মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্য গ্রাহকদের বিদ্যুৎ খরচ বুঝতে এবং বিল নিয়ে উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া জরুরি ব্যালেন্সের সুবিধা থাকায় রিচার্জের টাকা শেষ হয়ে গেলেও নির্দিষ্ট শর্তে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। শফিকুল আলমের মতে, প্রিপেইড মিটারের সুবিধা, ব্যবহারবিধি এবং বিভিন্ন চার্জ সম্পর্কে গ্রাহকদের মধ্যে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি দূর করতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া এবং গণমাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রচার করা উচিত।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক ইতোমধ্যে প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) ২৩ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ এ ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন। ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ জন গ্রাহকের মধ্যে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ জন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটার রয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ জনের। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বাবিউবো) মোট ৪৬ লাখ ৫ হাজার ১৯ জন গ্রাহকের মধ্যে ৩৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩১ জন প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বাসসকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব গ্রাহককে পর্যায়ক্রমে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। এ কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। তিনি বলেন, শুরুতে কিছু এলাকায় গ্রাহকদের মধ্যে প্রিপেইড মিটার নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব ছিল। তবে বর্তমানে এ নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। নেসকোর ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের বাড়িতে ইতোমধ্যে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নূর আহমদ বাসসকে বলেন, প্রিপেইড মিটারে রিবেটসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যা গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার অপরিহার্য। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ কমিয়ে আনা সম্ভব। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত তথ্য ও অভিযোগ জানাতে কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব হটলাইনেও গ্রাহকেরা যোগাযোগ করতে পারবেন।









