সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ জামায়াতের
সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে দলীয় বিবেচনায় ডিলারশিপ বণ্টন করা হয়েছে। এসব কারণে সার বিতরণব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে, যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। দেশজুড়ে সারসংকট এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে সংকটের অভাব নেই। যেখানেই হাত দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই সংকট দেখা যাচ্ছে। সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ করা হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি খাত ও সাধারণ মানুষের ওপর। বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে অনিয়ম এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কৃষিমন্ত্রীর হলেও সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর অভিযোগ, জেলায় গঠিত কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনজনকে মনোনীত করায় যোগ্য প্রার্থীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, সরকারের অব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং চোরাচালানের কারণে দেশে সারসংকট তৈরি হচ্ছে। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কিছু এলাকায় দলীয় প্যাডে ডিলারদের তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং সেই তালিকা বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের ঘটনাও ঘটেছে। দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির ১৪ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকায় সারসংকট দেখা দিয়েছে এবং কৃষকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক এলাকার বাসিন্দাকে অন্য এলাকায় ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। আগে কখনো সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমন ব্যক্তিরাও ডিলারশিপ পেয়েছেন। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলারশিপ দেওয়া, ভুয়া গুদাম ও ভুয়া চুক্তিনামা ব্যবহার করে লাইসেন্স নেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় বিএনপির প্যাডে দেওয়া ডিলার নিয়োগের একটি তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম পাওয়া গেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাদের ডিলারশিপ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর অভিযোগ, ডিলার নিয়োগে সংশ্লিষ্টরা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না। এমনকি হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; ডিলার নিয়োগের যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ড, তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ও লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি প্রকাশ; ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। এ ছাড়া সারসংকট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার বাস্তব পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা এবং তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানানোর দাবি জানায় দলটি। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত বলেছে, ভিত্তিহীন অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে কাউকে দায়ী করা উচিত নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগে বিএনপি চরম দলীয়করণ করেছে এবং সারসংকটের বিষয়ে সরকার জাতিকে অসত্য তথ্য দিয়েছে। গত ছয়-সাত মাসে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয়করণ, দুর্নীতি ও মন্ত্রীদের বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সরকারের ব্যর্থতা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি দেশবাসীকে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে সারসংকট ও ডিলার নিয়োগের অভিযোগের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গেও কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং অনুমোদিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে চায় জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু সরকার সেই প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর আদলে সবকিছু সাজানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে বিরোধী দলকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। এ অবস্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে গণভোটে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সরকার বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবে বলে তাঁরা আশা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মো. আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও ড. রেজাউল করিমসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকারও উপস্থিত ছিলেন।









