আমু-রাজ্জাক-দীপু মনিসহ আওয়ামী লীগের ৭ নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ

সময়: 9:54 am - November 2, 2026 |

কোর্ট রিপোর্টার:

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সোমবার (২ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এ অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা। অভিযোগভুক্ত অন্য ছয় আসামি হলেন—সাবেক কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। অভিযোগ দাখিলের পর সংবাদ সম্মেলনে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় নীতি এবং আওয়ামী লীগ ও ১৪-দলীয় জোটের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করেছিল। আসামিরা তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নীতিনির্ধারক হিসেবে আন্দোলন দমনে অংশগ্রহণ, সহযোগিতা, পরামর্শসহ বিভিন্নভাবে ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ১ হাজার ৪০০ আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানান, সাত আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। একমাত্র পলাতক আসামি মির্জা আজম।

তিনি বলেন, আমির হোসেন আমু আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, ঝালকাঠি-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ১৪-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও টাঙ্গাইল-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ছিলেন। শাজাহান খানও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক মন্ত্রী এবং মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ডা. দীপু মনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মন্ত্রী ও চাঁদপুর-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ছিলেন। ফারুক খান দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ছিলেন শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা। আর মির্জা আজম ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক মন্ত্রী ও জামালপুর-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য। প্রসিকিউটরের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এই সাত নেতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রেখেছেন। মামলায় প্রমাণ হিসেবে আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনার কথোপকথন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ২৯৯ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একটি নিরাপত্তা বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আন্দোলনকারী ও বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার, হত্যা এবং লাশ গুম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘এরেস্ট দ্য লিডারস অ্যান্ড দ্য প্রটেস্টরস অ্যান্ড দ্য ট্রাবলমেকার্স। কিল দেম অ্যান্ড হাইড দেয়ার বডিস।’ প্রসিকিউটর জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্যের সূত্র ধরে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনও মামলার প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের পার্থক্যের বিষয়টিও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারি হিসাবে ৮৩৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ উল্লেখ করা হয়েছে। বিবিসি নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৪ বলে নিরূপণ করেছে। প্রসিকিউটরের দাবি, নিহতের সংখ্যার এই পার্থক্যের পেছনে লাশ গোপন করার নির্দেশনার বিষয়টি ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা শনাক্ত করা কঠিন হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ বা আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং পরিকল্পিতভাবে এবং সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে দেশজুড়ে এসব হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন অপরাধের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধে পরিণত হয়েছে বলে মনে করে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলাটিকে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ের মামলা হিসেবে উল্লেখ করেন প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, সাত আসামির প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের ঊর্ধ্বতন অবস্থান, অধীনস্থদের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা এবং তৎকালীন সরকারপ্রধানকে বিভিন্নভাবে পরামর্শ ও সহযোগিতা করার বিষয়গুলো অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আসামিরা কীভাবে নিজেদের অবস্থান ও ক্ষমতা ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা, উসকানি, পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছেন, তা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে দেখানো হয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর