যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি

সময়: 9:15 am - May 2, 2026 |

মানব কথা: বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে শীতল যুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন আজ এমন এক বৈশ্বিক সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, যার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

বিভিন্ন গবেষণা ও সামরিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৫০টির মতো সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং বিদেশে মোতায়েন সেনা ও বেসামরিক কর্মীর সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি।

জার্মানিতে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি

এই উপস্থিতি শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়; বরং কৌশলগত প্রভাব, দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক আধিপত্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী। বিশেষ করে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেন—এই চারটি দেশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ।

জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে, যা ইউরোপে সবচেয়ে বড় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রামস্টেইন এয়ার বেস, স্টুটগার্টে ইউরোপ ও আফ্রিকা কমান্ডের সদর দপ্তর এবং ল্যান্ডস্টুল সামরিক হাসপাতাল—এসব স্থাপনা শুধু ইউরোপ নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মার্কিন অভিযানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

ইতালিতে প্রায় ১৩ হাজার এবং স্পেনে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মার্কিন সেনা রয়েছে। স্পেনের রোটা নৌঘাঁটি ও মোরন বিমানঘাঁটি এবং ইতালির বিভিন্ন ঘাঁটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করে।

যুক্তরাজ্যে ১৫টিরও বেশি ঘাঁটিতে প্রায় ১২ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এই ঘাঁটিগুলো নজরদারি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং বিমান হামলার প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সব মিলিয়ে ইউরোপে মার্কিন উপস্থিতি ন্যাটো জোটের নিরাপত্তা কাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর: চীনকে প্রতিরোধের কৌশল

এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি মূলত চীন ও উত্তর কোরিয়ার প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠেছে।

স্বাধীন অলাভজনক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’ বলছে, জাপানে সবচেয়ে বেশি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে—প্রায় ১২০টি এবং সেখানে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওকিনাওয়া দ্বীপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে মার্কিন নৌ ও বিমান ঘাঁটি রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে, যা কোরীয় উপদ্বীপে প্রতিরোধমূলক ভারসাম্য বজায় রাখার অংশ।

দেশটিতে অবস্থিত ক্যাম্প হামফ্রিজ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

এ ছাড়া, গুয়াম (মার্কিন ভূখণ্ড), ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এই অঞ্চলকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের কেন্দ্র বলা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাব মোকাবিলায় সামরিক সক্ষমতা জোরদার করছে।

মধ্যপ্রাচ্য: যুদ্ধ ও জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্র

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের এবং অত্যন্ত কৌশলগত।

কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা রয়েছে এবং এটি সেন্টকমের ফরোয়ার্ড হেডকোয়ার্টার বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে।

কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাকে একাধিক ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ব তেলের বড় অংশ এখান দিয়ে পরিবাহিত হয় এবং সামরিক উপস্থিতি সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আফ্রিকা: সীমিত কিন্তু কৌশলগত উপস্থিতি

আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি তুলনামূলক কম হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জিবুতির ক্যাম্প লেমনিয়ে আফ্রিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি, যেখানে ৪ হাজারের বেশি সেনা রয়েছে।

এ ছাড়া, কেনিয়া, সোমালিয়া ও নাইজারের মতো দেশে ছোট ছোট ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলো মূলত ড্রোন অপারেশন ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।

লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চল

লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি রয়েছে। কিউবার গুয়ানতানামো বে ঘাঁটি সবচেয়ে পুরোনো মার্কিন ঘাঁটি, যেখানে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার সেনা রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ড, কানাডা এবং বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলেও নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

কেন এত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। যেমন: যুদ্ধে দ্রুত মোতায়েন ও লজিস্টিক সুবিধা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি রুট নিয়ন্ত্রণ, মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি—বিশেষত চীন ও রাশিয়ার প্রভাব প্রতিরোধ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জার্মানি বা ইউরোপে সেনা কমানোর মতো সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো এই নেটওয়ার্কের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিলেও, সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি কমাচ্ছে না বরং কৌশলগতভাবে পুনর্গঠন করছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সেনা মোতায়েন বিশ্ব রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বাস্তবতা। এটি শুধু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার একটি প্রতীক। ইউরোপ থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি তার কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে সহায়তা করছে।

তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং মিত্রদের সঙ্গে মতবিরোধ, এই উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার বৈশ্বিক সামরিক ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করছে, নাকি আরও নতুনভাবে শক্তিশালী করছে?

সেই উত্তরই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর