৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০ হাজার শিক্ষকের জাতীয়করণের দাবি ‘বৈষম্যের অবসান করে দ্রুত জাতীয়করণ করা হোক’—শিক্ষকদের আকুল আবেদন
স্টাফ রিপোর্টার:শহিদুল ইসলাম:
দেশের প্রায় ৫ হাজার বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও এখনো তাদের চাকরি জাতীয়করণ হয়নি বলে দাবি করেছেন শিক্ষকরা। এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় ২০ হাজার শিক্ষককে চরম আর্থিক সংকট ও মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। শিক্ষকদের দাবি, দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে এসব বেসরকারি বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারি নথিভুক্ত তথ্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পৃথক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের জাতীয়করণের দাবি:
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (কেন্দ্রীয় কমিটি) যুগ্ম মহাসচিব সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল বলেন, প্রায় ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ২০ হাজারের মতো শিক্ষকের অধিকাংশই অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষক মারা গেছেন। কেউ কেউ বয়সের ভারে অবসর নিয়েছেন; কিন্তু কর্মজীবনে তারা কোনো বেতন-ভাতা বা পেনশন পাননি। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমরা বেতন ও চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছি। একজন শিক্ষককে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু বিনা বেতনে কাটাতে হচ্ছে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বৈষম্যমূলক।’
জাতীয়করণের উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়ন হয়নি:
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কনসালটেশন কমিটি গঠন করে বলেও দাবি করেন তারা। তবে শিক্ষকদের অভিযোগ, জাতীয়করণের উদ্যোগ ও প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কাজ করা শিক্ষকদের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের ভাষ্য, একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলে দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কর্মরত শিক্ষকরা কেন বৈষম্যের শিকার হবেন—এ প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
পরিবার চালাতে কেউ অটোরিকশা চালান, কেউ নিরাপত্তাকর্মী:
বিনা বেতনে শিক্ষকতা করতে গিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন অনেক শিক্ষক ও তাদের পরিবার। বিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি সংসারের খরচ চালাতে কেউ টিউশনি করছেন, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ রাতের বেলায় পার্টটাইম নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, নিয়মিত আয় না থাকায় সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যত্র চাকরির সুযোগও কমে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন, সেটিই তাদের একমাত্র কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে।
‘শিক্ষকরা রাজপথে, কর্মকর্তারা এসি কক্ষে’ :
শিক্ষকদের দাবি, বছরের পর বছর তারা শিশুদের পাঠদান করে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছেন। তাদের হাতে শিক্ষা নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। অথচ সেই শিক্ষকদেরই নিজেদের ন্যায্য অধিকার ও বেতনের দাবিতে বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হচ্ছে। সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল বলেন, ‘আমরা শিশুদের মানুষ করার দায়িত্ব পালন করি, অথচ আমাদেরই বেতনের দাবিতে রাস্তায় ধুলাবালির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকরা যখন রাজপথে আন্দোলন করছেন, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসি কক্ষে বসে কাজ করছেন। এই বৈষম্যের অবসান হওয়া প্রয়োজন।’
সরকারি সুবিধা চালুর দাবি:
শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি, মিড-ডে মিলসহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে অনেক বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাদের দাবি, বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের আওতায় আনার পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্যও সরকারি সুযোগ-সুবিধা চালু করা হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার আরও কার্যকর হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন:
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রায় ৫ হাজার বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল বলেন, ‘গ্রামের একটি পরিবার পরিচালনা করতে বর্তমানে মাসে অন্তত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোনো বেতন ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছি। আমরা সরকারের কাছে কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না; আমরা চাই আমাদের শ্রম ও শিক্ষাদানের স্বীকৃতি।’ তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন—দীর্ঘদিনের এই বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে ৫ হাজার বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করে তাদের মানবেতর জীবনযাপন থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।’
সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল
যুগ্ম মহাসচিব
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কেন্দ্রীয় কমিটি), ঢাকা









