গণভোট ও জুলাই চার্টার নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত আমিরের অভিযোগ

সময়: 12:30 pm - September 17, 2026 |

শহিদুল ইসলাম:

দেশবাসীকে দেওয়া বিভিন্ন ওয়াদা অস্বীকার করে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের মানুষের সামনে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। গণভোট, জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ‘সিন্ডিকেট ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি গণভোটের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু সরকার সেটি মানতে চাচ্ছে না। একইভাবে জুলাই চার্টার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, জনগণের সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের একটি নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে দলীয় কর্মী এবং বহু আগে বিদায় নেওয়া একজন ব্যক্তিকে অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব দিয়ে বসানো হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রবাসীদের অধিকার ও ভোটাধিকার প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যা দিলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই তাদের অধিকার নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বন্ধ বা খর্ব করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকলেও তারা দেশের নাগরিক। তাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার বন্ধ বা খর্ব করা হলে তা প্রবাসীদের প্রতি জুলুম হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সেমিনারের মূল বিষয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যেন চতুর্থবারের মতো অচলাবস্থা তৈরি না হয়, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজারকে ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ভাঙার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বারবার অচলাবস্থা তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন বাংলাদেশি শ্রমপ্রত্যাশীরা। তাই শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া যেন কোনো গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, বিরোধী দল ক্ষমতার বিজয় চায় না; তারা জনগণের বিজয় চায়। তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে এবং সংসদের বাইরে অন্যায় ও জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো আইনের বিরুদ্ধে তারা চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন। জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রতিবাদ করা হবে বলেও জানান তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়; জনগণের অধিকার ও স্বার্থের বিষয়গুলোও তুলে ধরা। সে কারণে জনস্বার্থবিরোধী কোনো আইন বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গেও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। তিনি বলেন, জনগণের মুখ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কোনো আইন করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়। জনগণের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। সেমিনারে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে গণভোট, জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর