রসায়নে নোবেল ২০২৬: পুরস্কার পেলেন হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াই

সময়: 11:38 am - October 7, 2026 |

জিয়াউল হক টুটুল:

চলতি বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং অসমমিত সংশ্লেষণে স্বয়ংক্রিয় অনুঘটন প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল বিজয়ী হিসেবে হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াইয়ের নাম ঘোষণা করা হয়। নোবেল কমিটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জীবদেহে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডসহ বিভিন্ন অণু অনেক সময় আয়না-প্রতিবিম্বের মতো দেখতে দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে। রাসায়নিকভাবে এই দুই রূপের গঠন অনেকটা একই হলেও জীবনের বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সাধারণত অণুর একটি নির্দিষ্ট রূপই ব্যবহৃত হয়। অণুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে রসায়নে সমহস্ততা বা কাইরালিটি বলা হয়। একটি বস্তুর ডান ও বাঁ হাত যেমন একে অপরের আয়না-প্রতিবিম্ব, তেমনি কিছু অণুরও দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ থাকে। এসব রূপকে একে অপরের ওপর পুরোপুরি মেলানো যায় না। জীবদেহের এনজাইম, প্রোটিন ও অন্যান্য জৈব অণুর সঙ্গে এ ধরনের অণুর পারস্পরিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একই অণুর দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ প্রায় সমান পরিমাণে তৈরি হতে পারে। কিন্তু জীবদেহের রাসায়নিক প্রক্রিয়া কিংবা ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে দুটি রূপের একটি অন্যটির তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত একটি নির্দিষ্ট রূপ তৈরি করার নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি উদ্ভাবন আধুনিক রসায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, হেনরি কাগানের গবেষণা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। ১৯৮৬ সালে তিনি রাসায়নিক বিক্রিয়ার দিক ও ফলাফল নিয়ন্ত্রণে অরৈখিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরেন। তার গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সামান্য কাইরাল পার্থক্যও কীভাবে উৎপন্ন অণুর নির্দিষ্ট একটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপকে বেশি পরিমাণে তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, কেনসো সোয়াই অসমমিত সংশ্লেষণে স্বয়ংক্রিয় অনুঘটন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন রাসায়নিক বিক্রিয়ার পদ্ধতি প্রকাশ করেন, যার মাধ্যমে সমহস্ত অণু তৈরির সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে সোয়াই এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাফল্য দেখান, যেখানে একটি নির্দিষ্ট আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে জীবদেহের কোনো উপাদান ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। দুই বিজ্ঞানীর গবেষণার মূল গুরুত্ব হলো—রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কীভাবে একটি নির্দিষ্ট আয়না-প্রতিবিম্ব রূপকে বেছে নেওয়া এবং তার উৎপাদন বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে নতুন জ্ঞান ও পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে রসায়নবিদরা এখন জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অণুর কাঙ্ক্ষিত রূপ নিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরির বিষয়ে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছেন। বিশেষ করে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে এ গবেষণার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য। কোনো ওষুধের অণুর দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ থাকলে মানবদেহে তাদের কার্যকারিতা বা আচরণ এক নাও হতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত রূপ তৈরি করতে পারা ওষুধের কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পণ্য তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে। নোবেল কমিটির মতে, কাগান ও সোয়াইয়ের কাজ রসায়নবিদদের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের পথ দেখিয়েছে, যা জীবনের মৌলিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাদের গবেষণা অসমমিত সংশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় অনুঘটনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এর আগে ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন ও ওমর এম. ইয়াগি। ধাতু ও জৈব উপাদানের সমন্বয়ে বিশেষ কাঠামো তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের ওই পুরস্কার দেওয়া হয়। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস শুরু হয় ১৯০১ সালে। আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিও নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ ও যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কারকে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর