অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ঠেকাতে পুলিশকে মানবাধিকার প্রশিক্ষণ
তালুকদার বেলাল:
পুলিশের পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে বলপ্রয়োগ, পেশাগত নীতি ও সততাবিষয়ক অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ জোরদার করছে বাংলাদেশ পুলিশ। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঝুঁকি কমানো এবং দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদস্যদের আরও সংযত, দক্ষ ও মানবিক করে তুলতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘সর্বনিম্ন বলপ্রয়োগের’ নীতি সম্পর্কে পুলিশ সদস্যদের ধারণা স্পষ্ট করতে দেশের ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে ৯০০ সদস্যকে পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৮১৮ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রশিক্ষণ সম্পন্নের হার ৯০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ, বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও গণআন্দোলনের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ এবং মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, দৈনন্দিন পুলিশিং কার্যক্রমে বলপ্রয়োগের মূলনীতির ওপর প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের সময় কখন এবং কীভাবে বলপ্রয়োগ করা উচিত, তা পুলিশ কর্মকর্তাদের অনুধাবন করতে সহায়তা করাই এ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও পুলিশ সদস্যরা যাতে আইনানুগ, যৌক্তিক ও পেশাদার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্যতা, জবাবদিহি এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতিটি ব্যাচে ১ হাজার ২৪০ জন করে আরও দুটি পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ ব্যাচ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি এবং দেশের ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে বলপ্রয়োগের আইনি সীমা, পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল সম্পর্কে পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা আরও বাড়বে।তবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনবলসংকট ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো এবং নিয়মিতভাবে চালু রাখতে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বলপ্রয়োগবিষয়ক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানবাধিকার, পেশাগত নীতি ও সততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পৃথক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৮০৪ জন পুলিশ সদস্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এমন পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, যাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষতা তৈরিতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ছাড়া নারী, শিশু ও বয়স্কদের সহায়তায় পরিচালিত সার্ভিস ডেস্কে কর্মরত সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের উদ্যোগও রয়েছে। এর মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলন দমনে গুলিবর্ষণ, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও সামনে আসে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারেন। নিহতদের অনেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জীবনের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষার গুরুত্ব সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সম্ভব হলে উত্তেজনা প্রশমন ও অহিংস পদ্ধতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। বলপ্রয়োগ অনিবার্য হলে তার মাত্রা প্রয়োজনের বাইরে যাওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান মাঠপর্যায়ে কতটা প্রয়োগ হচ্ছে, তার কার্যকর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থায়ন, জনবল বৃদ্ধি, নিয়মিত পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থাও পুলিশের পেশাগত মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের চলমান প্রশিক্ষণ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনে এসব নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংযম, নিরপেক্ষতা ও নাগরিকের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে পুলিশি সেবার মান উন্নয়ন এবং জনআস্থা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।









