নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান: ৮ মাসে জরিমানা প্রায় ৩ কোটি টাকা

সময়: 8:57 am - October 14, 2026 |

মানব কথা ডেস্ক:

দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এসব অভিযানে মোট ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি সাতজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনা মনিটরিং এবং ১ হাজার ২১০টি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল, অনিরাপদ উপাদানের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণসহ বিভিন্ন অনিয়ম প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তদারকি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে সংস্থাটি। বিএফএসএর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে প্রধান কার্যালয়ের উদ্যোগে আটটি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। মার্চে প্রধান কার্যালয়ের ছয়টি অভিযানে চার লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭৭টি অভিযানে ৩৬ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এপ্রিলে প্রধান কার্যালয়ের ১৩টি অভিযানে তিন লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭৬টি অভিযানে আট লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। মে মাসে প্রধান কার্যালয়ের ১১টি অভিযানে ছয় লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭৪টি অভিযানে ১৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ মাসে তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জুনে প্রধান কার্যালয়ের ১২টি অভিযানে চার লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭২টি অভিযানে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ সময় একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জুলাইয়ে প্রধান কার্যালয়ের ১৫টি অভিযানে ছয় লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ১০৪টি অভিযানে ৪২ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ মাসেও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আগস্টে প্রধান কার্যালয়ের ২৫টি অভিযানে ১০ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ১৭২টি অভিযানে ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সেপ্টেম্বরে প্রধান কার্যালয়ের ২৩টি অভিযানে ১২ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৫৬টি অভিযানে ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন খাদ্য প্রতিষ্ঠানে অনিবন্ধিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, লেবেলবিহীন মাছ-মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ এবং খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যসনদ ও পেস্ট কন্ট্রোলের প্রমাণক না থাকার মতো অনিয়ম শনাক্ত করেছে বিএফএসএ। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযানেও উঠে এসেছে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের নানা অনিয়ম। এর মধ্যে রয়েছে পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি, পোড়াতেল ব্যবহার, অননুমোদিত রাসায়নিক রং প্রয়োগ, উৎপাদনস্থলে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপস্থিতি, অনুমোদনহীন ঘি ব্যবহার এবং নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএফএসএর সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলমান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী অভিযান ও মনিটরিং বাড়াতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যের মূল উপাদানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ রং, গন্ধ ও ক্ষতিকর অ্যাডিটিভসের ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনা মনিটরিং করেছে বিএফএসএ। বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান এবং খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবেশন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হয় এসব মনিটরিং কার্যক্রমের মাধ্যমে। এ ছাড়া খাদ্যপণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ে একই সময়ে ১ হাজার ২১০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার আওতায় ছিল বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মসলা, শিশু খাদ্য এবং বেকারি পণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী।

নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সচেতনতামূলক টিভিসি ও স্ক্রলবার্তা, বাংলাদেশ বেতারে অডিওবার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, রিলস ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং ভোক্তাদের করণীয় সম্পর্কে প্রচার চালানো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং, খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০১৫ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। আইন অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অপরাধভেদে এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। খাদ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ উপাদানের ব্যবহার প্রতিরোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও কঠোর আইন রয়েছে।

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় আর্থিক জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্য বিক্রি, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার এবং অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর ক্ষতি বা ভোক্তার মৃত্যুর ঘটনায় আরও কঠোর দণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে, চীনের খাদ্য নিরাপত্তা আইনেও ভেজাল ও মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ মেশানোকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের উচ্চ অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। গুরুতর ঘটনায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিএফএসএ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী অভিযান, মনিটরিং, খাদ্য নমুনা পরীক্ষা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর