রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে সরকার
মানব কথা ডেস্ক:
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে সরকার। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্র এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে অনুসৃত কূটনৈতিক উদ্যোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায়। অতীতের সফল প্রত্যাবাসন প্রমাণ করে, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা থাকলে এ সংকটে অগ্রগতি সম্ভব। শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বিএনপি সরকারে থাকার সময় রোহিঙ্গাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসনের ইতিহাস আমাদের রয়েছে।’ তিনি মনে করেন, এবারও প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। শামা ওবায়েদের ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
এরপর ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সে সময় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয় বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, এসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা নয়, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় বেগম খালেদা জিয়ার মানবিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। সে সময় চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়া সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং তাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চলতে থাকায় দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয় এবং অন্যান্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনির্দিষ্টকাল ধরে শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সরকার। শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা অন্তত প্রত্যাবাসন শুরু করতে চাই।’ তার মতে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে তাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরিই হওয়া উচিত বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আগের উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম পার্থক্য হলো আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাত্রা। শামা ওবায়েদের মতে, অতীতের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। শামা ওবায়েদ বলেন, ‘ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া কাজ করেনি। এটি ব্যর্থ হয়েছে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে সমঝোতা করলেও বড় পরিসরে সংগঠিত প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। এ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, জাতিসংঘ এখন এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হবে।’
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ। শামা ওবায়েদ জানান, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এখনো কঠিন। তবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—উভয় চ্যানেলেই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তার মতে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত এবং একাধিক কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সহজ নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায়ও গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকট নিরসনে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি; বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ; পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো। এর পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও শেষ পর্যন্ত সেখানেই নিহিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। নিউইয়র্ক সফরকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গে বৈঠকে আরও জোরালো ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব থাকায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে দেশটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন শামা ওবায়েদ। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়। একই সঙ্গে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করে ঢাকা।এ ছাড়া তুরস্কসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সংকটের সমাধান দ্রুত হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। শামা ওবায়েদের ভাষায়, ‘এটি অত্যন্ত কঠিন একটি সমস্যা। রাতারাতি এর সমাধান হবে না।’
প্রত্যাবাসনের উপযোগী রোহিঙ্গাদের যাচাই ও পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ। এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ বারবার মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়ে আসছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি জাতিসংঘের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মাধ্যমে কার্যকর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়াই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ, যাতে বাস্তব অর্থেই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।










