জুলাই সনদ অনুযায়ী পিএসসি সংস্কার ও নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধের দাবি ছাত্রশিবিরের
সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ বন্ধ, পুলিশ ভেরিফিকেশনের লিখিত মানদণ্ড প্রকাশ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সংস্কারে ১২ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
শহিদুল ইসলাম:
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। এ সময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ নতুন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পিএসসির সংস্কার এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জুলাই সনদের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। পিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
পিএসসির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সংগঠনটি জানায়, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘চায়ের আমন্ত্রণের’ পর পিএসসির আরও দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। ছাত্রশিবিরের দাবি, এসব ঘটনা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল। পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখায় নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) ও সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পদে প্রশাসন ক্যাডার থেকে চুক্তিভিত্তিক দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জালিয়াতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও এক হাজার ২০০-এর বেশি প্রার্থী নিয়োগ পাননি বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। রাজনৈতিক স্ক্রুটিনি ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে নিয়োগ আটকে দেওয়ার অভিযোগও আনে সংগঠনটি। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয় খোঁজার অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করার উদ্যোগ এবং সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ছাত্রশিবির। ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ৫৬ জন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রত্যাশার পরিপন্থী।
পিএসসি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ:
১. জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসির কাঠামো পুনর্গঠন করে তিনটি পৃথক কমিশন গঠন এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সংসদ ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্বচ্ছ বাছাই কমিটি গঠন।
২. নবম ও দশম গ্রেডসহ সরকারি সব চাকরির নিয়োগ পিএসসির অধীনে আনা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া ও ফলাফল প্রকাশে মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো পক্ষের অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
৩. সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের সময়ে নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ বহাল রাখা। এর মধ্যে রয়েছে কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন, কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ (সিবিআই), প্রশ্নফাঁস রোধে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস, ওএমআর ট্র্যাকিং এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি।
৪. মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর জনবল চাহিদার ভিত্তিতে পিএসসির সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ।
৫. বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ।
৬. রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা বা কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রতি বৈষম্য বন্ধ করা। সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত না হলে কোনো প্রার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ না দেওয়া।
পুলিশ ভেরিফিকেশন ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা:
৭. সাধারণ সরকারি নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, যাচাইয়ের মানদণ্ড ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের পরিচয় লিখিতভাবে প্রকাশ।
৮. জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও প্রাসঙ্গিক অপরাধসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা।
৯. ভেরিফিকেশনে কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থন, আপিল ও পুনর্বিবেচনার কার্যকর সুযোগ রাখা।
১০. মৌখিক পরীক্ষার জন্য অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো ও নির্ধারিত মানদণ্ড প্রণয়ন এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
১১. মৌখিক পরীক্ষার অস্বচ্ছতা ও মূল্যায়নে অসঙ্গতি যাচাইয়ের জন্য ভাইভার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ এবং সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা।
১২. প্রশ্নফাঁস ও প্রক্সি পরীক্ষা প্রতিরোধে নিরাপদ প্রযুক্তি, ডিজিটাল নজরদারি এবং পিএসসির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ জনবল নিয়োগ।
‘চাকরি রাজনৈতিক পুরস্কার দেওয়ার জায়গা নয়’
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মীদের পুরস্কৃত করার জায়গা নয়; এটি রাষ্ট্রের সেবা করার দায়িত্ব। তাই নিয়োগের ভিত্তি হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততা। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।









