মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশ ও সাদা চামড়ার প্রটোকল: একটি আত্মমর্যাদার সংকট

সময়: 9:26 am - May 7, 2026 |

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান:​ব্রিটিশ রাজের সূর্য এদেশ থেকে অস্তমিত হয়েছে সাত দশকের বেশি সময় আগে। ভৌগোলিক মানচিত্রে আমরা স্বাধীন, কিন্তু আমাদের মনোজগতে কি আজও কলোনিয়াল বা উপনিবেশিক শাসনের শিকল রয়ে গেছে? এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া এবং সচিবালয়ের কিছু অতি-উৎসাহী কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একজন বিদেশি ডেপুটি হাইকমিশনারের সাথে রাষ্ট্রের তিনজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টার একত্রে বৈঠক করার ঘটনাটি আমাদের প্রটোকল সচেতনতা এবং জাতীয় আত্মমর্যাদাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

​মনোজগতে কলোনিয়ালিজম ও ‘ইনফিওরিটি কমপ্লেক্স’

​মনস্তাত্ত্বিক ফ্রান্তজ ফানো (Frantz Fanon) তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস’-এ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে উপনিবেশিক শক্তি শাসিতের মগজে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যে, শাসকই হলো শ্রেষ্ঠ আর শাসিত হলো হীন। এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক শৃঙ্খলের নামই হলো ‘পোস্ট-কলোনিয়াল ইনফিওরিটি কমপ্লেক্স’। আমাদের সমাজে আজও সাদা চামড়ার প্রতি যে মুগ্ধতা এবং অহেতুক ভক্তি দেখা যায়, তা মূলত সেই পুরনো ভয়ের সংস্কৃতির অবশিষ্টাংশ। একজন সাধারণ সাদাচামড়ার বিদেশি পর্যটককে দেখলে আমরা যেভাবে ‘হাঁটু গেড়ে’ অভিবাদন জানাই বা তাদের সাথে ছবি তুলে স্বর্গীয় সুখ অনুভব করি, তা আমাদের চরম মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

​কূটনৈতিক রাষ্ট্রাচার বনাম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা

​আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘পারস্পরিক সমতা’ (Reciprocity)। ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, একজন কূটনীতিকের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার পদের ওপর ভিত্তি করে। রাষ্ট্রাচার বা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ (Warrant of Precedence) কেবল লাল বাতির গাড়ির জন্য নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

​যখন একজন বিদেশি ডেপুটি হাইকমিশনার (যিনি দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির কূটনীতিক) দেশের একজন পূর্ণ মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং একজন উপদেষ্টার সাথে একই টেবিলে বসেন, তখন কূটনৈতিক শিষ্টাচার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূতরা যখন বিদেশে একজন সচিবের সাক্ষাৎ পেতে হিমশিম খান, তখন আমাদের দেশে একজন জুনিয়র কূটনীতিকের জন্য মন্ত্রী পর্যন্ত ‘অ্যাক্সেস’ পাওয়া এত সহজ কেন? এই অতি-আতিথেয়তা মূলত আমাদের কূটনৈতিক দরকষাকষির সক্ষমতাকে বিশ্বের দরবারে নড়বড়ে করে দেয়। এটি ‘ইনস্টিটিউশনাল ডিভ্যালুয়েশন’ বা প্রতিষ্ঠানের অবমূল্যায়ন ছাড়া আর কিছু নয়।

​প্রটোকল লঙ্ঘনের নেতিবাচক প্রভাব

​এই ধরণের চর্চার প্রভাব সুদূরপ্রসারী:

১. জাতীয় মর্যাদার হানি: রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের এমন আচরণ বহিঃবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।
২. কূটনৈতিক দরকষাকষিতে দুর্বলতা: বিদেশিরা বুঝে নেয় যে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সাথে দেখা করা অত্যন্ত সহজ, ফলে তারা যথাযথ প্রটোকল মানার প্রয়োজন বোধ করে না।
৩. প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ: মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র অফিসারদের কাজ যখন মন্ত্রীরা করেন, তখন প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

​উত্তরণের পথ:

ডিকলোনাইজেশন অব মাইন্ড

​সাদা চামড়াকে ভাগ্যবিধাতা ভাবার এই মাদকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, সম্মান কেবল পাওয়ার বিষয় নয়, আদায়ের বিষয়। এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘ওরিয়েন্টালিজম’ তত্ত্বে যেমনটি দেখিয়েছেন- পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব চাপিয়ে দেয় তখনই, যখন আমরা মানসিকভাবে তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করি।

​একটি স্বাধীন দেশের মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের সময় অত্যন্ত মূল্যবান। সেই সময় তারা কাকে দেবেন এবং কোন প্রটোকল বজায় রাখবেন, তা হওয়া উচিত রাষ্ট্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে। বিদেশে নিযুক্ত আমাদের কূটনীতিকরা যেন সেখানে প্রাপ্য সম্মান পান, তা নিশ্চিত করতে হলে ঢাকার সচিবালয়েও সমমর্যাদার নীতি (Principle of Reciprocity) কঠোরভাবে পালন করতে হবে।

আমাদের ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে ৫৪ বছর আগে, এখন সময় এসেছে আমাদের মনোজগৎকে স্বাধীন করার। সাদা চামড়ার প্রতি এই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ‘কুর্নিশ’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমরা বিশ্বমঞ্চে সমমর্যাদার অংশীদার হতে পারব না। রাষ্ট্রের প্রটোকল রক্ষা করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি সার্বভৌমত্বের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর