২০১৩ সালের জাতীয়করণে বাদ পড়া প্রায় ৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়
শহিদুল ইসলাম:স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৩ সালে দেশের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার পরও প্রায় ৫ হাজার বিদ্যালয় এখনো জাতীয়করণের বাইরে রয়েছে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। শিক্ষক নেতাদের দাবি, বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলোতে এখনো নিয়মিত পাঠদান চলছে। কিন্তু সরকারি বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, একই সঙ্গে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমপর্যায়ের সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩ বিদ্যালয় জাতীয়করণ:
প্রকাশিত সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৩ সালের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ কার্যক্রমে ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর বাইরে থাকা প্রায় ৫ হাজার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলো জাতীয়করণের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তালিকায় স্থান পায়নি। তবে ঠিক কোন কোন বিদ্যালয় কী কারণে বাদ পড়েছিল, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ সরকারি তালিকা প্রকাশ্যে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ পড়ার অভিযোগ:
শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জাতীয়করণের সময় কিছু বিদ্যালয়কে রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট সরকারি নথি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শিক্ষক নেতারা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ২০১৩ সালের জাতীয়করণ-সংক্রান্ত নথি, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
১৩ বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই পাঠদান:
শিক্ষক সংগঠনের দাবি, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলোর অনেক শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই পাঠদান করে আসছেন। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করার কারণে শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে দাবি সংগঠনটির। অনেক শিক্ষক জীবিকা নির্বাহের জন্য বিদ্যালয়ের পাশাপাশি টিউশনি, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য কাজ করছেন বলেও তাঁরা জানান। শিক্ষকদের ভাষ্য, একজন শিক্ষক যখন বছরের পর বছর কোনো বেতন-ভাতা ছাড়া দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর নিজের পরিবার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা এবং অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের সরকারি সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন:
জাতীয়করণের বাইরে থাকা বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির ক্ষেত্রে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তবে কোন বিদ্যালয়ের কত শিক্ষার্থী কী কী সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—এ বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
জাতীয়করণের শর্ত পূরণ নিয়ে দাবি:
শিক্ষকদের দাবি, ২০১৩ সালের জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল, জমির বৈধতা, পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলোর অনেক প্রতিষ্ঠান এসব শর্ত পূরণ করেছিল বলেও দাবি তাঁদের। এ কারণে কোন বিদ্যালয় কেন জাতীয়করণের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি কী সুপারিশ করেছিল এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল—এসব তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।
২০২৫ সালেও আন্দোলন:
জাতীয়করণের দাবিতে ২০২৫ সালেও রাজধানীতে অবস্থান, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। দীর্ঘদিনের দাবির পরও কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। শিক্ষক নেতাদের ভাষ্য, ২০১৭ সাল থেকে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্যোগের দাবি
শিক্ষক সংগঠনের নেতারা দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাদ পড়া প্রায় ৫ হাজার বিদ্যালয়ের জাতীয়করণের বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে চিঠি ও পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁরা দাবি করেন। তবে এসব উদ্যোগের বর্তমান অগ্রগতি এবং জাতীয়করণের বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।
কী চায় শিক্ষক সমিতি:
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির দাবি, ২০১৩ সালের জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলোর নথিপত্র ও যোগ্যতা পুনঃযাচাই করে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনতে হবে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সাদ্দাম হোসেন রুহান মণ্ডল বলেন, “আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। যোগ্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলোর জাতীয়করণ চাই। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকরা বিনা বেতনে শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সরকার মানবিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।” এতে একদিকে দীর্ঘদিনের বেতন-ভাতা বঞ্চনা থেকে হাজারো শিক্ষক ও তাঁদের পরিবার মুক্তি পাবেন, অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার আওতায় আসবে। ১৩ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।









