বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণ নয়, সরকারি মালিকানা চায় শ্রমিক ফেডারেশন
শহিদুল ইসলাম :স্টাফ রিপোর্টার:
সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারিকরণের প্রস্তাবকে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক ফেডারেশন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার, সরকারি মালিকানা বজায় রাখা এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি জানান সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান।
সিস্টেম লসের অজুহাতে বেসরকারিকরণ নয়:
মুজিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারিকরণের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা দেশের বিদ্যুৎ খাত ও সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থের পরিপন্থি। তিনি দাবি করেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। ভবিষ্যতে তা আরও কমে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে সিস্টেম লসকে কারণ দেখিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারিকরণের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
বেসরকারিকরণে বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম:
ফেডারেশনের এই নেতা বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে গেলে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ার পাশাপাশি সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারী, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের চাকরির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।তিনি বলেন, এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। তাই জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকারকে বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে।
বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে সতর্কতা:
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মুজিবুর রহমান বলেন, যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা ও জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারিকরণের পর নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। কোথাও আর্থিক সংকট, কোথাও বিনিয়োগের ঘাটতি এবং কোথাও সেবার মানের অবনতির কারণে পুনরায় সরকারি মালিকানায় ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম তদন্তের দাবি:
বিদ্যুৎ খাতে অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ অপচয় ও পাচারের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। মুজিবুর রহমান বলেন, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে সরকারের দায়-দেনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
সংস্কারে ফেডারেশনের একাধিক প্রস্তাব:
বিদ্যুৎ খাত সংস্কারে সংবাদ সম্মেলনে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরে ফেডারেশন। এর মধ্যে রয়েছে—
- সব বিদ্যুৎ কোম্পানিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে একীভূত করা অথবা বর্তমান বিতরণ ব্যবস্থার সংস্কার;
- কোম্পানি পরিচালনায় অযাচিত আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা;
- শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা;
- সরকারি মালিকানায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি;
- বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ;
- অপ্রয়োজনীয় উচ্চপদ বিলুপ্ত করে ব্যয় সংকোচন;
- প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী জনবল নিয়োগ এবং
- আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধ করা।
সরকারি মালিকানা বজায় রাখার আহ্বান:
ফেডারেশনের নেতারা বলেন, বিদ্যুৎ কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি জনজীবন ও জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে মুনাফাভিত্তিক বেসরকারি খাতে না দিয়ে সরকারি মালিকানায় রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কাজী মোশাররফ হোসেনসহ সংগঠনের অন্যান্য শ্রমিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।









