দুধে ভেজাল মেশালে কঠোর ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ বাণিজ্যমন্ত্রীর
তাহের মাহমুদ:
দুধে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি ও ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বুধবার পাবনা জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে ভেজাল দুধ প্রতিরোধে দুগ্ধ খামারি, উৎপাদক, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব নির্দেশনা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘শিশুখাদ্য হিসেবে দুধের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সেই দুধে ভেজাল মিশিয়ে শিশুদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এমন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।’ তিনি বলেন, দেশের দুগ্ধ উৎপাদন ও দুগ্ধজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে পাবনার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি জেলার দুধ উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় ভেজালের খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গুটিকয়েক অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে একদিকে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাবনার দুগ্ধশিল্পের দীর্ঘদিনের সুনাম। দুধে ভেজাল প্রতিরোধে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি ভেজাল দুধ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
মন্ত্রী বলেন, নিরাপদ দুধ নিশ্চিত করা শুধু সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে খামারি, সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই দুধে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব। সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, দুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পাবনার বিভিন্ন চিলিং সেন্টারে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, দুধ উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন—প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মানসম্মত দুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম জানান, মতবিনিময় সভার আগে তিনি পাবনার চাটমোহর ও আটঘরিয়া উপজেলায় প্রাণ গ্রুপ এবং ফারুক চিলিং সেন্টার পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে প্রাণ গ্রুপের চিলিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ জানায়, দুধের গুণগত মান সন্তোষজনক না হওয়ায় ওই দিন পাঁচটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আনা দুধ ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সভায় সভাপতির বক্তব্যে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, পাবনা দেশের অন্যতম প্রধান দুগ্ধ উৎপাদনকারী জেলা। অল্পসংখ্যক অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে জেলার হাজার হাজার সৎ ও পরিশ্রমী খামারির সুনাম ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না। তিনি জানান, ভেজাল দুধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি দুধের গুণগত মান পরীক্ষা এবং ভেজাল শনাক্তকরণের জন্য পাবনায় একটি স্থায়ী পরীক্ষাগার স্থাপনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। জেলা প্রশাসক বলেন, দুধের মান পরীক্ষার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ভেজাল শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ দুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে। মতবিনিময় সভায় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পাবনা জেলা সভাপতি, চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি, পাবনা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি, এনএসআইয়ের যুগ্ম পরিচালক, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং দুগ্ধ খামারি, সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা দুধে ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় নিরাপদ দুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।









