তীব্র তাপপ্রবাহে হারাচ্ছে নদী ও জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহ

সময়: 12:40 pm - June 17, 2026 |

নিজাম উদ্দিন: দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাবে নদী, খাল, বিল ও অন্যান্য জলাধারের পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে। একসময় যে নদীগুলো বছরের অধিকাংশ সময় প্রবাহমান থাকত, এখন সেগুলোর অনেক অংশে জেগে উঠছে চর, কোথাও কোথাও সৃষ্টি হচ্ছে বিস্তীর্ণ বালুচর। পরিবেশবিদ ও জলসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার ফলে দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থায় এক নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। জলবায়ু গবেষক ডক্টর মাহমুদা ফেরদৌস বলেন, “তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাষ্পীভবনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ফলে নদী ও জলাশয়ের পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে পরিবর্তন আসায় স্বাভাবিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে।” তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অনেক নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে ইতোমধ্যে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, “যে নদীতে একসময় সারা বছর নৌকা চলত, এখন সেখানে হেঁটেই পার হওয়া যায়। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি আরও কমে যাচ্ছে।” কুষ্টিয়ার কৃষক মিজানুর রহমান জানান, সেচের জন্য নদীর ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করে ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হচ্ছে।

জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “নদীর প্রাণ হলো তার প্রবাহ। যখন পানি কমে যায়, তখন শুধু নদী নয়, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, জীববৈচিত্র্য কমে যায় এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সংকুচিত হয়ে পড়ে।” তিনি আরও বলেন, নদীর তলদেশে পলি জমে প্রবাহ কমে যাওয়ার সমস্যাও এখন অনেক অঞ্চলে প্রকট। মৎস্যজীবীরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। পাবনার জেলে সাইদুল ইসলাম বলেন, “পানি কমে যাওয়ায় মাছের সংখ্যা আগের মতো নেই। জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।” বরিশালের এক মৎস্যচাষি জানান, অনেক জলাশয়ে পানির স্তর এতটাই নেমে গেছে যে মাছ চাষ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিকও। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং স্থানীয় ব্যবসা-সবখাতেই এর প্রভাব পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ ডক্টর তানভীর আহমেদ বলেন, “নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নদীর প্রবাহ কমে গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি সংকটের কারণে সুপেয় পানির প্রাপ্যতাও কমে যেতে পারে। ডক্টর ফারহানা কবীর জানান, “যখন নদী ও জলাশয়ের পানি কমে যায়, তখন অনেক এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দেয়। এর ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং পানিবাহিত রোগের আশঙ্কাও বাড়ে।” সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। রাজশাহীর কলেজশিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন বলেন, “ছোটবেলায় যে নদীকে বিশাল মনে হতো, এখন সেখানে বালুচর দেখা যায়। প্রকৃতির এই পরিবর্তন ভয় জাগায়।” খুলনার গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, “পানি কমে গেলে কৃষি, মাছ, এমনকি দৈনন্দিন জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা সবাই এর প্রভাব অনুভব করছি।” পরিবেশবিদদের মতে, নদী রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নদী খনন, অবৈধ দখল ও দূষণ বন্ধ, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র তাপপ্রবাহে নদী ও জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে যাওয়ার এই চিত্র কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে, আর হারিয়ে যেতে পারে বহু নদীর চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর