জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত শিল্প খাত, রপ্তানিতে ধসের শঙ্কা

সময়: 7:13 am - June 22, 2026 |

 মানব কথা:তীব্র জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, ডলার অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারে মন্দার চাপে দেশের শিল্প খাত গভীর সংকটে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, আর সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বিমুখী চাপ—দেশীয় বাজারে মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো—শিল্প খাতকে টিকে থাকার লড়াইয়ে ঠেলে দিয়েছে।

জ্বালানি সংকটে থমকে উৎপাদন:

শিল্পাঞ্চল সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্রে জানা গেছে, অনেক কারখানায় যেখানে গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা, সেখানে মিলছে মাত্র ১–২ পিএসআই। এতে উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।ফলে কারখানাগুলো বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে, এতে উৎপাদন ব্যয় ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

উৎপাদন কমছে শিল্পখাতে:

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ওয়েভিং টেক্সটাইল: ২৯.৩১% কম
  • জুট টেক্সটাইল: ৩৫.৫০% কম
  • ওষুধ শিল্প: ১০.৮১% কম
  • সিমেন্ট ও নির্মাণ উপকরণ: ৫.৯৪% কম

এসব খাতে উৎপাদন কমায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি উভয়ই ব্যাহত হচ্ছে।

বিনিয়োগ খরা ও ব্যাংকিং চাপ:

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোয় বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কঠোর ঋণনীতির কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা বিনিয়োগে না গিয়ে ব্যাংকেই পড়ে রয়েছে।

রপ্তানি খাতে চাপ:

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে সময়মতো উৎপাদন ও রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন হাজার কারখানার মধ্যে অনেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

ইস্পাত ও নির্মাণ খাতেও মন্দা:

রড, সিমেন্ট ও নির্মাণ শিল্পও বড় সংকটে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, ফলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেছে। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানার প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ছোট ও মাঝারি মিল ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করেছে।

চামড়া ও রপ্তানিতে সম্ভাবনা হারানো:

বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়লেও পরিবেশগত মানদণ্ড ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় চামড়া শিল্প সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি অংশ দখল করতে পারছে বাংলাদেশ।

প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ:

বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও নীতিগত সহায়তার কারণে দ্রুত বাজার দখল করছে। ফলে বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি বাজারগুলোতেও চাহিদা কমছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা:

অর্থনীতিবিদ ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহার ও নীতিগত দুর্বলতা দ্রুত সমাধান না হলে শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও প্রবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।তাদের মতে, শিল্প খাত বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর