খরার করাল থাবায় নিরাপদ পানির সংকট, বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
মিজানুর রহমান: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশে। কখনও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী খরা—প্রকৃতির এই চরম বৈরী আচরণের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন খরাপ্রবণ এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় সংকটের নাম *নিরাপদ পানি*। পানির অভাব শুধু কৃষি উৎপাদন, গবাদিপশু কিংবা জীবিকাকেই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, স্বাস্থ্যবিধি এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন খরাপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপে আর আগের মতো পানি উঠছে না। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কোথাও আবার কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া এখন অনেক পরিবারের জন্য প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। পানির সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যবিধির ওপর। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক পরিবার হাত ধোয়া, গোসল, কাপড় পরিষ্কার, রান্না কিংবা টয়লেট ব্যবহারের পর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মতো প্রয়োজনীয় কাজেও পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করছে। এতে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। নিরাপদ পানির অভাব শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। পর্যাপ্ত পানি না থাকলে মানুষ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারে না। এর ফলে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, চোখের সংক্রমণ, পানিবাহিত রোগ এবং বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি খরার সময়কাল আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। খরাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি সংগ্রহ। অনেক পরিবারকে প্রতিদিন কয়েকবার দূরের নলকূপ বা পানির উৎসে যেতে হচ্ছে। এক বালতি পানি আনতেই অনেক দূরে যেতে হয়। তাই প্রতিটি ফোঁটা পানি হিসাব করে ব্যবহার করি। প্রয়োজন থাকলেও অনেক সময় গোসল বা কাপড় ধোয়া পিছিয়ে দিতে হয়। আগে সেচের জন্য পানি পাওয়া কঠিন ছিল, এখন ঘরের কাজের জন্যও পানি জোগাড় করা কঠিন হয়ে গেছে। কৃষিকাজ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে।”*
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির সংকটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী নারী, শিশু এবং বয়স্ক মানুষ। অধিকাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারীদের ওপর থাকায় তাদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হচ্ছে। এতে সময়ের অপচয়ের পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপও বাড়ছে। গ্রামীণ সমাজে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব প্রধানত নারীদের ওপরই বর্তায়। এতে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আয়মুখী কর্মকাণ্ড এবং পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব পালনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক কিশোরীকেও স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে পানি সংগ্রহে সময় দিতে হচ্ছে।”চিকিৎসকদের মতে, পানির অভাবে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো অনুসরণ না করতে পারলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম। শিশু বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদুল করিম বলেন, নিরাপদ পানি ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, পানিবাহিত সংক্রমণ এবং অপুষ্টির ঝুঁকি বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”*
জলসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও এই সংকটকে তীব্র করেছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমরা বছরের পর বছর ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করেছি, কিন্তু পুনঃভরণ বা সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখনই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল-বিল-পুকুর পুনরুদ্ধার এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”*পরিবেশবিদদের মতে, নিরাপদ পানির সংকট এখন আর শুধু কৃষি বা পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। পানি সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে, মানুষের আয় হ্রাস পাচ্ছে, আবার একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় খরাপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য আলাদা পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নতুন নিরাপদ পানির উৎস সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে এই সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা কেবল একটি মৌলিক অধিকার নয়, এটি সুস্থ সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত। তাই খরাপ্রবণ অঞ্চলে পানি সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।









