নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বদলে যাচ্ছে প্রত্যন্ত জনপদের জীবন

সময়: 10:55 am - July 18, 2026 |

রুহুল আমীন মোল্লা: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে, যা অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে থাকা কিংবা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের মুখোমুখি অনেক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হতে পারে। তবে তাঁরা এটিও উল্লেখ করছেন যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব গ্রাম এখনো সৌরশক্তির আওতায় আসেনি এবং প্রযুক্তিটির আরও বিস্তার প্রয়োজন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “সৌরশক্তি বাংলাদেশের মতো রৌদ্রপ্রধান দেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস। যেখানে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পৌঁছানো কঠিন বা ব্যয়বহুল, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।” তাঁর মতে, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যাটারির সক্ষমতা বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে সৌরশক্তির ব্যবহার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষক ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ শুধু আলো জ্বালানোর জন্য নয়, ছোট ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।”

কুড়িগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “আগে সন্ধ্যার পর পড়াশোনা বা কাজ করতে অনেক সমস্যা হতো। এখন সৌরবিদ্যুতের কারণে রাতে আলো পাওয়া যায় এবং মোবাইল ফোনও চার্জ দেওয়া যায়।” রাঙামাটির গৃহিণী রোকসানা চাকমা বলেন, “সৌরবিদ্যুতের কারণে ঘরের অনেক কাজ সহজ হয়েছে। শিশুদের পড়াশোনাও নিয়মিত করা সম্ভব হচ্ছে।” কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “সৌরচালিত সেচব্যবস্থা কৃষকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। এটি জ্বালানি ব্যয় কমাতে সাহায্য করতে পারে এবং কৃষিকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে ভূমিকা রাখতে পারে।” তিনি বলেন, স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় প্রযুক্তি নির্বাচন করা জরুরি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সোহেল মিয়া বলেন, “সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে দোকানে আলো রাখতে পারি। বিদ্যুৎ না থাকলেও ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া সহজ হয়।” নীলফামারীর কলেজশিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এখন রাতে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারে। প্রযুক্তির এই সুবিধা শিক্ষা ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।” পরিবেশবিদ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির ব্যবহার শেষে সেগুলোর পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নতুন পরিবেশগত সমস্যা তৈরি না হয়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা, বিনিয়োগ, সহজ অর্থায়ন এবং স্থানীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।জ্বালানি নীতিবিদ ডক্টর সায়মা রহমান বলেন, “পরিষ্কার জ্বালানির দিকে রূপান্তর শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই রূপান্তর হতে হবে পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর।” বিশ্লেষকদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এখনো অনেক এলাকায় এই সুবিধা পুরোপুরি পৌঁছায়নি, তবুও সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সুফল ভোগ করতে পারবেন। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর