প্রকল্প বাস্তবায়নে সংস্কার ও জবাবদিহিতা জোরদার করবে সরকার : জোনায়েদ সাকি

সময়: 2:31 pm - July 22, 2026 |

মানব কথা:পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব কমানো, জবাবদিহিতা জোরদার করা, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন, নির্মাণ খরচের রেট শিডিউল সংশোধন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তদারকি বাড়াতে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। আজ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরে (পিআইডি) সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রোধ এবং সরকারি বিনিয়োগকে আরো কার্যকর করার লক্ষ্যে এসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যেখানে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল সমন্বয়, দায়িত্বের ওভারল্যাপ এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে এবং বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে। তিনি জানান, আজকের একনেক সভায় মোট ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার একটি প্রকল্প পর্যবেক্ষণসহ ফেরত দেওয়া হয়েছে। একনেকের সুপারিশ অনুযায়ী সংশোধন করে প্রকল্পটি পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে।

সাকি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি প্রকল্প বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং জনগণের করের অর্থের সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্পভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন থেকে অনুমোদিত প্রতিটি প্রকল্প এই নির্দেশনা অনুসারেই বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা প্রকল্প প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করছেন। কোথায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে তা চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং জনগণের প্রতিটি টাকা যেন আরো দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’ প্রতিমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লাগা সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন, প্রচলিত নিয়মে একনেকের অনুমোদনের পরও কেবল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) পেতেই দেড় থেকে দুই বছর সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় উন্নয়ন কাজের গতি কমে যায় এবং প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এই দীর্ঘসূত্রতা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পেতে বিলম্ব ঘটায়। উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ সাকি জানান, সরকার তাই প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করছে।তিনি জানান, চলমান প্রকল্প এবং এডিপির ‘গ্রিন পেজ’-এ অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পগুলো ‘রি-স্কোপিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদান সংযোজন, বিয়োজন, সম্প্রসারণ বা সংকোচন করা হবে।

এর লক্ষ্য হলো সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বর্তমানে চারটি বড় সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। প্রথমত, পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। এর সারসংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর এটি জাতীয় নীতিপত্র হিসেবে প্রকাশ করা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের জন্য দায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করে তা দূর করার সুপারিশ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ইতোমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। সাকি জানান, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগে একটি খসড়া নীতিমালাও প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই নীতিমালায় স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন এবং পিডিদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ মডিউল ও প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার আশা করছে সরকার।

চতুর্থত, পরিকল্পনা বিভাগ, আইএমইডি, বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ (বিপিপিএ), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নাগরিক ডাটাবেজসমূহকে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়করণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্মাণকাজের সংশোধিত রেট সিডিউল প্রণয়নে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে দুই দফা বৈঠক করেছে এবং আগামীকাল আবার বৈঠকে বসবে। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও কেন ব্যয় বেড়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে সাকি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন, ভ্যাট ও করের হিসাবের পরিবর্তন, মূল ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকা ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর এবং নতুন পাঁচটি উপাদান সংযোজনের কারণেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। জবাবদিহির বিষয়ে তিনি বলেন, খুলনার রূপসা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে বিলম্বের ঘটনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন হবে বলে সরকার আশা করছে। তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে, সরকারি জবাবদিহি জোরদার হবে, এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। সূত্র :-বাসস

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর