নির্বাচনী ইশতেহার : স্মার্ট ও মানসম্পন্ন শিক্ষার রূপান্তরে মাউশির একগুচ্ছ উদ্যোগ

সময়: 8:09 am - August 4, 2026 |

মানব কথা:প্রথাগত কাঠামোর স্থবিরতা ভেঙে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় লেগেছে স্মার্ট শিক্ষার রূপান্তরের নতুন হাওয়া। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বহুমুখী কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত, প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষকদের বদলি ও নিয়োগে স্বচ্ছতা, জলবায়ু অভিযোজন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিতে মাউশি হাতে নিয়েছে একগুচ্ছ রূপরেখা। মাউশি অধিদপ্তরকে একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ শিক্ষায় বৈষম্যহীন ও স্মার্ট শিক্ষার রূপান্তরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে আমরা নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছি। এর মধ্যে প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা ও শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাইজেশনকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগগুলো ‘হোল স্কুল অ্যাপ্রোচ’ এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। আমাদের মূল লক্ষ্য— শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।’

ডিজিটাল অটোমেশন ও প্রশাসনিক সংস্কার

মাউশি জানিয়েছে, অধিদপ্তরের আওতায় সেবাগ্রহীতাদের দ্রুততম সময়ে সেবা প্রদান ও প্রশাসনিক কাজের গতি ফেরাতে পরিচালক এবং উপ-পরিচালক পর্যায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পত্র গ্রহণ শাখার যাবতীয় অনিয়ম ও নথি গায়েবের ঘটনা দূর করতে এ শাখাকে শতভাগ আধুনিকায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাউশির ‘শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতি’ (ইএমআইএস)-কে পেনিট্রেশন টেস্টিং ও সিকিউরিটি অডিটের মাধ্যমে ক্লাউড মাইগ্রেশন করে আপগ্রেডেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাউশি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এর ফলে বেসরকারি শিক্ষকদের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও) প্রদান, সরকারি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্যবিবরণী (পিডিএস) হালনাগাদ, শূন্যপদের তালিকা প্রণয়ন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্যসহ হালনাগাদ প্রতিবেদন তৈরি অত্যন্ত সহজ ও নির্বিঘ্ন হবে। এর বাইরে ইএমআইএসে কর্মরত ইনহাউজ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিক্ষক) মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট, ডিজিটাল ইনভেন্টরি সফটওয়্যার এবং অফিশিয়াল ওয়েব পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেল আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বচ্ছ বদলি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা:

মাউশি জানিয়েছে, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে ডাইনামিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় বদলি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। প্রবেশ পর্যায়ের অন্যান্য এমপিও পদে নিয়োগের সুপারিশ প্রণয়নে তৈরি হচ্ছে পৃথক সফটওয়্যার। অন্যদিকে, বিগত ১৭ বছরে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হওয়া বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফেরাতে জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে।

সর্বজনীন মনিটরিং ও ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ:

মাউশি অধিদপ্তর জানিয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক তদারকি জোরদারে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরাকে কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে মাউশি ও বিভাগীয় মনিটরিং সেল থেকে তা সুপারভিশন করা হবে। অন্যদিকে পরিবেশ ও জলবায়ু অভিযোজনে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব সৃষ্টিতে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ বা লেইস প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ২৯ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে ৮৮ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। সম্প্রতি এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

উদ্ভাবন, ই-লার্নিং ও ৬টি নতুন স্কিম:

মাউশি জানায়, এসইডিপি কর্মসূচির আওতায় ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, স্কাউটিং সম্প্রসারণ, কলেজ শিক্ষকদের উন্নয়ন, ‘শিক্ষাবিদ ইনস্টিটিউট’ স্থাপন, নতুন মাউশি ভবন নির্মাণ এবং সমন্বিত শিক্ষার্থী কল্যাণ কর্মসূচিসহ ৬টি নতুন স্কিম তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আগের সরকারের আমলের ৩টি স্কিমের নাম পরিবর্তন ও রিস্কোপিং করে খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও বিনামূল্যের স্কুল ব্যাগ প্রদানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ‘এডুকেশন এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম (ইইএসএস)’- এর আওতায় সারাদেশে ৮ হাজার ২৯টি উদ্যোগ থেকে নির্বাচিত ১০১টি সেরা উদ্ভাবনী উদ্যোগকে পুরস্কৃত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিজয়ী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ২০ জনকে ইউনিসেফের সহায়তায় ‘গেইম ফর গার্লস’ প্রকল্পের মাস্টার ট্রেইনার করা হয়েছে, যা আগামী ৩ বছরে ১০০ জন শিক্ষক ও ৫০০ জন ছাত্রীকে এডুকেশনাল গেইম ডেভেলপার হিসেবে গড়ে তুলবে।

বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ২১টি মেগা প্রকল্প:

মাউশির রূপরেখা অনুযায়ী, শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরে মন্ত্রণালয়ে ২১টি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব এবং ১৮টি ধারণাপত্র পাঠানো হয়েছে। এতে রয়েছে— সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই দেওয়া, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, আনন্দময় শিক্ষা (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস), বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদান, বৈষম্য নিরসন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষা উন্নয়ন, পৃথক শিক্ষা চ্যানেল এবং গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আহতদের সহায়তাদান। মাউশি জানায়, দেশের প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের গণিত ও বিজ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তুলতে জাইকা, বুয়েট, খান একাডেমি ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের সহায়তায়  ‘ডিজিটাল লার্নিং সিস্টেম’ এবং ‘লার্ন ম্যাথ উইথ খান একাডেমি’ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। জাইকার অনুদানে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জাপানে এক মাসের ‘এডুকেশন পলিসি ফর্মুলেশন’ প্রশিক্ষণে পাঠানোর প্রস্তাব ইআরডিতে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এডিবির সহায়তায় দেশের ৪৭১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সার্ভে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর ড. মীর জাহীদা নাজনীন বাসস’কে বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা ২১টি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব ও আরও ১৮টি প্রকল্পের ধারণাপত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে, যা মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত এবং স্মার্ট শিক্ষার রূপান্তরে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

মাউশির রূপরেখা অনুযায়ী, মেয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে ‘মনের বন্ধু’ কর্মসূচির পাশাপাশি ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘হেলথ প্রমোটিং স্কুল’ হিসেবে গড়ে তুলতে দুইটি কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গ্রিন স্কুল কারিকুলাম, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, ‘প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ড কাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা’ আয়োজন এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে ‘স্কুল নিউট্রিশন প্রোগ্রাম’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাউশি অধিদপ্তর জানিয়েছে, একই সাথে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও কানাডা সরকারের অনুদানে এবং ইউএনএফপিএ-এর সহায়তায় সিডব্লিউএফডি- এর মাধ্যমে গাইবান্ধা, জামালপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, ভোলা, খাগড়াছড়ি, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও কুড়িগ্রাম- এই ৯টি জেলার ৮৮০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য কিশোরীদের ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং এমএইচএম-বান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা। সূত্র : বাসস

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর