‘স্মার্ট ও গ্রিন ঢাকা’ গড়তে ডিএসসিসির ১,৯০৪ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা

সময়: 12:28 pm - August 25, 2026 |

মানব কথা:রাজধানীর দক্ষিণ অংশকে আধুনিক, যানজটমুক্ত, সবুজ ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। এ পরিকল্পনায় সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল, কাঁচপুরে বাস টার্মিনাল উন্নয়ন, ধানমন্ডি লেকের পরিবেশগত উন্নয়ন এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে বাসসকে জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশের ভারসাম্য, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নগরের নান্দনিকতা নিশ্চিত করেই দক্ষিণ ঢাকাকে একটি ‘স্মার্ট ও গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তারা। ডিএসসিসির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বাবদ মোট ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৯৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন। এ খাতে এবার ৮০৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে মূল বরাদ্দ ছিল ৭২৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে তা দাঁড়ায় ৭২৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো উন্নয়নে চলতি অর্থবছরে গত বছরের মূল বরাদ্দের তুলনায় ৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বেশি রাখা হয়েছে।

এই বরাদ্দের বড় অংশই যাচ্ছে সড়ক ও মহাসড়ক উপখাতে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে সর্বোচ্চ ৫২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ সিটি এলাকার সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এবারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু প্রচলিত অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকছে না ডিএসসিসি। নগরের যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির ২২টি ইন্টারসেকশনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বাসসকে বলেন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। যানবাহনের চাপ ও চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করে এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল পরিচালনা করা গেলে যানজট কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর মূল্যবান সময়ও সাশ্রয় হবে। নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় উদ্যোগ হচ্ছে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের প্রস্তুতি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এ লক্ষ্যে কাঁচপুর বাস টার্মিনালের প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, শেড, টিকিট কাউন্টার ও টয়লেট নির্মাণে চলতি অর্থবছরে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের কার্যক্রম কাঁচপুরে স্থানান্তর করা সম্ভব হলে রাজধানীর ভেতরে দূরপাল্লার বাসের প্রবেশ ও চলাচল কমবে। এতে যানজট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নগরের অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহনের চাপও কমানো সম্ভব হবে। নগরের পরিবেশ ও নাগরিক বিনোদনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে এবারের উন্নয়ন পরিকল্পনায়। ধানমন্ডি লেকের অবকাঠামো ও পরিবেশগত উন্নয়ন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।  লেকটি আরও নান্দনিক ও নাগরিকবান্ধব করে তোলার পাশাপাশি এর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে। ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, নগরের উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তা ও ভবন নির্মাণকে বোঝালে হবে না। নাগরিকদের হাঁটাচলা, বিনোদন এবং নির্মল পরিবেশ পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণে ধানমন্ডি লেকসহ নগরের উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘স্মার্ট ঢাকা’র পাশাপাশি ‘গ্রিন ঢাকা’ গড়ার পরিকল্পনাতেও এবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন খাতে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘জিরো সয়েল’ কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন সড়কের মিডিয়ানে বৃক্ষরোপণ ও ঘাস লাগানো হয়েছে।

পাশাপাশি ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ থেকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন মিডিয়ান ইজারা দিয়ে সেখানে নান্দনিক গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে আরও টেকসই করতে ওসমানী উদ্যানে ডিএসসিসির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একটি স্থায়ী নার্সারি স্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রশাসক জানান, ইতোমধ্যে সেখানে ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের প্রায় ১ হাজার ৪০০টি গাছের চারা সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী বছর এ নার্সারি থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। শুধু ওসমানী উদ্যানেই নয়, নগর ভবনের দক্ষিণ পাশে আরও একটি নার্সারি স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলছে। ফলে ভবিষ্যতে ডিএসসিসির নিজস্ব নার্সারি থেকেই নগরের বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণের জন্য প্রয়োজনীয় চারা সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকা দক্ষিণকে সবুজ করতে শুধু বড় বড় প্রকল্প নিলেই হবে না; সড়কের মিডিয়ান, পার্ক, খোলা জায়গা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাতে হবে। এজন্য নিজস্ব নার্সারি গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি ঢাকা চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান, যোগাযোগ হবে আধুনিক, পরিবেশ হবে সবুজ এবং নাগরিকরা স্বস্তির সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।’ ডিএসসিসির প্রশাসক আরও বলেন, নগর উন্নয়নের সুফল তখনই স্থায়ী হবে, যখন এর সঙ্গে নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা যুক্ত হবে। সড়ক, ফুটপাত, পার্ক, লেক কিংবা সবুজায়নের অবকাঠামো রক্ষায় নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ডিএসসিসির এবারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একদিকে যেমন বড় অঙ্কের অর্থ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘উন্নয়নের লক্ষ্য হবে মানুষের জীবনকে সহজ করা। সেই লক্ষ্যেই সড়ক থেকে ট্রাফিক, পরিবেশ থেকে বিনোদন-সব ক্ষেত্রকে সমন্বিত করে কাজ করা হচ্ছে।’ সূত্র : বাসস

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর