প্রকৌশলী নিজেই যখন ঠিকাদার, কর্তৃপক্ষের আস্কারায় বেপরোয়া শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম
শহিদুল ইসলাম:
ম্যাজিক রেট হোক বা বর্তমান নিয়মে এসএলটি , কোন পদ্ধতিতেই আটকানো যাচ্ছেনা শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম এঁর টেন্ডার বানিজ্য। রাজধানীর শেরে বাংলা নগর প্রশাসনিক এলাকায় ৩টি বেসমেন্ট সহ ১২ তলা সরকারি সমন্বিত অফিস ভবন (অভ্যন্তরীণ স্যানিটারি ও পানি সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতায়ন কাজ সহ) নির্মাণ প্রকল্পের কাজে বারংবার পছন্দের ঠিকাদারের সাথে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দরপত্র মূল্যায়নে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। প্রথমে দরপত্রটি আহবান করা হয় ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে তার পূর্বসূরী নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসানের সময়ে। সে সময়ে পূর্ত সচিব কাজী ওয়াসী উদ্দীনের সাথে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কুশলী নির্মাতা লিমিটেড এঁর বিশেষ সখ্যতা ছিল। সে মোতাবেক ম্যাজিক রেট দিয়ে দেন ওয়াসীউদ্দীনের ভাগ্নে মেহেদী। মন্ত্রণালয়ের ঘাট পেরোলেও ৫ আগস্ট ২০২৪ পট পরিবর্তন হলে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রী সভার বৈঠকে তা বাতিল হয়ে যায়। এঁর পর জহুরুল ইসলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পদ মর্যাদার বিশেষ সহকারী জনাব আলী ইমাম মজুমদার এঁর তদবীরে মেহেদীকে সরিয়ে শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পোস্টিং বগিয়ে নেন। এই চেয়ারে বসেও তিনি তার লাগাম ছাড়া দূর্নীতির ধারা অব্যহত রাখেন। বাতিল হওয়া এই সমন্বিত অফিস ভবনের দরপত্র টি তিনি নতুন করে আহবান করেন। প্রায় ১২০ কোটি টাকা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের এই দরপত্রে এবারও হুবুহু ১০%(দশ শতাংশ ) নিম্নদর দিয়ে কাজটি দিতে সুপারিশ করা হয় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিঃ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু এই অনিয়মের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে পৌছালে দুদক গত ২১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে একটি অভিযান পরিচালনা করে। দুদকের ওই অভিযানের পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অভিযোগের সত্যতা পেয়ে দরপত্রটি বাতিল করে দেয়। আহবানকৃত ঐ দরপত্রের আইডি ছিল ১১২০৮৫৩। দাপ্তরিক প্রাক্কলন একটি গোপনীয় বিষয় তা প্রকিউরিং এনটিটি ছাড়া অন্য কারো জানার সুযোগ নেই, অথচ ঠিকাদারকে তখনকার পিপি আর অনুযায়ী রেট দিয়ে হুবুহু দশ শতাংশ নিম্ন দর আহবানের মতো গুরুতর অপরাধ করে জহুরুল থেকেছেন ধরা ছোয়ার বাহিরে। এমনকি মন্ত্রণালয় দোষীদের বিরুদ্ধে কোন তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করেনি। তাহলে রেট কে ফাস করে দিলো, ভূতে? উল্টো, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাতিল করা দরপত্রটি পুনরায় আহবান করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজটি পাইয়ে দেওয়ার জন্য ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
দরপত্রটি বাতিল হয়ে যাওয়ার পরে পুনরায় প্রাক্কলন অনুমোদন করে দরপত্র আহবান করেন যার আইডি নম্বর ১২০৭৪৯৯ । একশত বিশ কোটি সাত লাখ আঠার হাজার টাকা প্রাক্কলিত মূল্যের এই দরপত্রে মোট ১৩ টি দরপত্র জমা হয়। প্রাথমিকভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা জামাল এন্ড কোম্পানিকে কাজটি পাইয়ে দিতে ১০ কোটি টাকায় সমঝোতা হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে প্রেরনের পূর্বে প্রতিশ্রূত অর্থ না দেয়ায় পুনর্মূল্যায়ন করে জামাল এন্ড কোম্পানি কে নন রেসপন্সিভ করে বাদ দেয়া হয়। এবার কুশলী নির্মাতা লিমিটেড এঁর সাথে আরও বেশী টাকা লেনদেন হয়েছে মর্মে জানা যায়। কুশলীর টাকা পেয়ে তারা এত গদগদ হয়ে যান যে ফ্রণ্ট লোডিং এঁর জন্য অতিরিক্ত জামানত কর্তনের সুপারিশ না রেখেই ফাইল মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়ে দেন। ফলে যথারীতি তা ফেরত আসে। পরে মূল্যায়ন কমিটি আবার জামানতের সুযোগ রেখে সংশোধিত সুপারিশ প্রেরন করে। এই কুশলী নির্মাতার এমডি জনাব রফিকুল ইসলাম আপাদ মস্তক ফ্যাসিস্ট এঁর অর্থের যোগান দাত ও ভারতীয় দালাল। রফিক এক সময়ে প্রশিকা নামক এনজিওতে বড় পদে যুক্ত ছিলেন, তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল জলিলের ৩০ এপ্রিল ট্রাম কার্ড কর্মসূচী সফল করতে প্রশিকার কর্মীদের ঢাকায় এনে লোক জড়ো করে সহিংশতার মাধ্যমে সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
এর আগেও, শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বরাদ্দের টাকা কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারের সাথে আঁতাত করে সম্পূর্ন বিল পরিশোধ করার অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ঢাকার শ্যামলীস্থ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল ও ঢাকার মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস এন্ড ট্রেনিং সেন্টার ও ১০০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু হাসপাতাল (MFSTC) মেরামতের জন্য ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিলেন। এই বরাদ্দের টাকা কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারের সাথে আঁতাত করে সম্পূর্ন বিল পরিশোধ করেছিলেন জহুরুল ইসলাম। তিনি ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দিতেই এই কাজ করেছিলেন বলে জানা যায়।
প্রকৌশলী যখন নিজেই ঠিকাদারঃ জহুরূল তার দপ্তরে রাজস্ব বাজেটের আওতায় সকল মেরামত কাজ নিজেই করেন। যে ঠিকাদারই কাজ পাক না কেন তিনি তাকে চুক্তিমূল্যের ৬৫% টাকা না দিলে তিনি কোন ঠিকাদারকে বিল দেন না। ইজিপি পোর্টালে তার নির্ধারিত ঠিকাদারের বাহিরে কেউ কাজ পেয়ে গেলে তাকে গা’র জোড়ে বাতিল করে দেন, কোন কারনে বাতিল করা সম্ভব না হলে তিনি NoA প্রদান করলেও চুক্তি করেন না। চুক্তির সময়ই তাকে দশ পার্সেন্ট টাকা দিয়ে দিতে হয়। পরে কাজ আগেই করিয়ে ফেলেছেন এসব বাহানা দেখিয়ে আরও পঞ্চান্ন পার্সেন্ট টাকা দাবি করেন। তার দাবির কাছে নতি স্বীকার না করলে তিনি নান ভাবে হয়রানি করে বিল দেননা। ফলে বাধ্য হয়ে ঠিকাদাররা তার দাবি অনুযায়ী ৬৫% টাকা দিয়ে যান। এভাবে তিনি ঠিকাদারদের একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের লাভ ধরিয়ে দিয়ে নিজে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এবছর মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের তেত্রিশ লক্ষ ছিয়ানব্বই হাজার টাকা মূল্যের একটি মেরামত কাজে ৬৫% টাকা চাওয়ার তার একটি কল রেকর্ড আমাদের হাতে রয়েছে।
এরকম হাজারো দূর্নীতির অকাট্য প্রমান থাকা সত্বেও জহুরুল থেকে যাচ্ছেন ধরা ছোয়ার বাহিরে। তিনি একটি শক্তিশালী সিণ্ডিকেট মেইন্টেইন করেন বলেই এত বেপরোয়া। অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের সাথে তার লেনদেনের খোলামেলা সম্পর্ক আছে। শের এঁর উপর শোয়া শের , তিনি আবার সন্ধ্যা হলেই স্যারদের নিয়ে অভিজাত বারে লাল পানির আসর বসান, সেখানে নাকি আবার দুষ্টু কোকিল ও বলেরে কুক কুক কুক কু।












