পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেলপথে যুক্ত হবে দেশের দুই প্রান্ত, ব্যয় ৬০ হাজার কোটি
তাহের মাহমুদ:
দেশের উত্তর প্রান্তের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি পৃথক প্রকল্পের সমন্বয়ে এ রেল করিডর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট চালু হলে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে এই করিডরে নতুন করে প্রায় ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রায় আড়াইশ ট্রেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ এই রেলপথ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে। একদিকে হিমালয়ঘেঁষা পঞ্চগড়, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী কক্সবাজার—দেশের দুই প্রান্তকে রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত করার ফলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। পর্যটন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, পঞ্চগড়সহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ যাতে সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রকল্প সাড়ে চার বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে এই পথে ট্রেন চলাচল শুরু করা যাবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আধুনিক ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদকে দক্ষিণের সমুদ্রতটের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। তাঁর মতে, এই রুট চালু হলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরাসরি ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে এবং পর্যটন ও অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাঁচটি প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এগুলো হলো—টঙ্গী থেকে আখাউড়া, লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী, শান্তাহার থেকে বগুড়া এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে নতুন রেললাইন যুক্ত করে উত্তর থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত একটি সমন্বিত করিডর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কোথাও নতুন লাইন নির্মাণ, কোথাও বিদ্যমান লাইন উন্নয়ন এবং কোথাও ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে রুটটিকে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পাঁচ প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হবে। পাশাপাশি নতুন ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহের বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
বাড়বে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ:
রেলওয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন এই করিডরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াত সহজ হওয়া। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষকে কক্সবাজার যেতে বর্তমানে একাধিক রুট ও পরিবহন পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করতে হয়। সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে এ ক্ষেত্রে সময় ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি যাতায়াতের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প তৈরি হবে। শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এ রুট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য ও অন্যান্য পণ্য দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাজারে দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ পাবে। একইভাবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল থেকে বিভিন্ন পণ্য উত্তরাঞ্চলের বাজারে পরিবহন করা সহজ হতে পারে।
পর্যটন ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব:
কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ পর্যটন খাতেও নতুন গতি আনতে পারে। সরাসরি ট্রেন চালু হলে উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ তুলনামূলক সহজে কক্সবাজারে যাতায়াত করতে পারবেন। এতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা আরও মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধিও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়লে সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এত দীর্ঘ রেল করিডর বাস্তবায়নে অর্থায়ন, জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজের সময়সীমা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলো শেষ করা গেলে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দেশের অন্যতম দীর্ঘ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হবে। রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রুট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের উত্তর প্রান্ত থেকে বঙ্গোপসাগরের উপকূল পর্যন্ত একটি বড় রেল করিডর গড়ে উঠবে। এর ফলে শুধু দুই প্রান্তের মানুষের যোগাযোগই সহজ হবে না, দেশের রেল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি ও সক্ষমতাও নতুন মাত্রা পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।










