আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকলে ফৌজদারি ব্যবস্থা: হাইকোর্ট

সময়: 11:02 am - September 13, 2026 |

জিয়াউল হক টুটুল:

আদালতের কোনো রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতি আহ্বান করাকে অবৈধ ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালতের রায় বা আদেশের প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘট কিংবা হরতাল ডাকা হলে সংশ্লিষ্ট বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোববার বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ে আদালত বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সব নির্বাহী ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আদেশ পালন করতে বাধ্য। কোনো রায় বা আদেশে কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে তার বিরুদ্ধে আপিলসহ প্রচলিত আইনে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আদালতের রায় বা আদেশের প্রতিবাদে হরতাল, ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি আহ্বান আইনসম্মত নয়। আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মসূচি শুধু আদালতের রায় বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে না, বরং বিচার বিভাগের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনেরও শামিল। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মসূচি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হাইকোর্টের রায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, কোনো আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট বা কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে পরিবহন ধর্মঘটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধেও আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের মতে, বিচারিক রায়ের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য আইনে নির্ধারিত পথ রয়েছে। আপিল বা অন্যান্য আইনানুগ প্রতিকার চাওয়াই সেই পথ। আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে এমন কর্মসূচি গ্রহণের সুযোগ নেই।

এই রায়ের পেছনে রয়েছে ২০১১ সালের একটি আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনার মামলা। ওই বছরের আগস্টে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ‘ডিলাক্স পরিবহন’-এর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক ও সম্প্রচারক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত বাসচালককে সাজা দেন। ওই সাজাকে কেন্দ্র করে বাস মালিকদের পক্ষ থেকে পরিবহন ধর্মঘট ও হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে সড়ক পরিবহনে অচলাবস্থা ও জনভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট দায়ের করে।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১ মার্চ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করেন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল প্রত্যাহার এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের ওই নির্দেশের পরদিন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। পরে আদালতের জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয় বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রুলটি অ্যাবসোলিউট ঘোষণা করে রায় দেন। হাইকোর্টের এ রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে, আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হলে তা চ্যালেঞ্জ করার জন্য সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে। রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট বা কর্মবিরতির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আদালতের এ রায়ের ফলে বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্মসূচি ঘোষণার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট আইনি অবস্থান তৈরি হলো। একই সঙ্গে আদালতের রায় ও আদেশের প্রতি সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের বাধ্যবাধকতাও আরও স্পষ্ট হয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর