সাগর-রুনি হত্যা কি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত? চলছে আইনগত পর্যালোচনা

সময়: 11:33 am - September 13, 2026 |

কোর্ট রিপোর্টার:

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না, তা আইনগতভাবে পর্যালোচনা করছে ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে নিহত সাংবাদিক দম্পতির পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া লিখিত অভিযোগ পরীক্ষা করে দেখছে প্রসিকিউশন। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডকে প্রাথমিকভাবে একটি ব্যক্তিগত বা একক হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে কোনো ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি এর সঙ্গে ব্যাপক বা সিস্টেমেটিক অপরাধের কোনো যোগসূত্র রয়েছে—সেটিই এখন আইনগত পর্যালোচনার বিষয়। এ হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত ‘widespread or systematic offenses’ বা ব্যাপক ও পরিকল্পিত অপরাধের আওতায় পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ:

২০১২ সালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও তাঁর স্ত্রী সাংবাদিক মেহেরুন রুনি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার শেষ না হওয়ায় নিহত সাংবাদিক দম্পতির পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই হতাশা রয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবিতে মামলার বাদী ও পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই অভিযোগের আইনগত ভিত্তি এবং মামলাটি ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না, তা এখন পরীক্ষা করা হচ্ছে। চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি নয়, এর পেছনে কোনো বৃহত্তর, ব্যাপক বা সিস্টেমেটিক অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

এখতিয়ার না থাকলে পিবিআইয়ের তদন্ত চলবে:

ট্রাইব্যুনালের পর্যালোচনায় যদি প্রতীয়মান হয় যে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনগত এখতিয়ারভুক্ত নয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে তা জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বর্তমান তদন্ত কাঠামো অনুযায়ী পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) অথবা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাই মামলার তদন্তে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ, ট্রাইব্যুনাল মামলাটির বিচারিক এখতিয়ার গ্রহণ করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত পিবিআইয়ের চলমান তদন্ত কাঠামো বহাল থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ মামলার তদন্তে একাধিকবার তদন্তকারী সংস্থা ও কর্মকর্তা পরিবর্তনের পরও হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি। ফলে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া পরিবারের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

নতুন একটি সূত্র পিবিআইকে দেওয়া হবে:

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে অন্য একটি ঘটনার সূত্র ধরে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও একজন সামরিক কর্মকর্তার মধ্যকার ফোনালাপ বা যোগাযোগের একটি সূত্র পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। তবে ওই যোগাযোগের সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো জানানো হয়নি। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সূত্র পিবিআইয়ের চলমান তদন্তে সহায়তার জন্য শেয়ার করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এতে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন কোনো সূত্র বা তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেটিও এখন পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।

১২ বছর পরও অমীমাংসিত হত্যা:

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও মামলার তদন্তে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি এখনো রয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি পরীক্ষা করে দেখছে—ঘটনাটি তাদের আইনগত এখতিয়ারের আওতায় পড়ে কি না। ট্রাইব্যুনালের পর্যালোচনার ফলাফলের ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে। তবে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার না থাকলেও মামলার তদন্ত বন্ধ হয়ে যাবে না। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পিবিআই বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার মাধ্যমেই তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের তদন্তে পাওয়া প্রাসঙ্গিক তথ্য পিবিআইকে দেওয়া হলে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তা নতুন কোনো দিক উন্মোচন করে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর