সাগরে গভীর নিম্নচাপ: উপকূলে বাড়ছে বৃষ্টি, বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত
তাহের মাহমুদ:
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ আরও শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সাগর উত্তাল থাকায় মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে এটি ১৮ দশমিক ১ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৫ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছিল। এ সময় গভীর নিম্নচাপটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ৮৭৫ কিলোমিটার, কক্সবাজার থেকে ৮৫০ কিলোমিটার, মোংলা থেকে ৬৯৫ কিলোমিটার এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সিস্টেমটি আরও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত নাগাদ ভারতের উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি আঘাতের আশঙ্কা কম থাকলেও উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে।
বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার:
গভীর নিম্নচাপের কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার। দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে এ গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে। গভীর নিম্নচাপের কেন্দ্রের কাছাকাছি সাগর উত্তাল রয়েছে। এ কারণে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গভীর সাগরে না যাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এর আগে নিম্নচাপটি যখন আরও দুর্বল অবস্থায় ছিল, তখনও চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছিল।
বাংলাদেশে সরাসরি আঘাতের আশঙ্কা কম:
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, গাণিতিক মডেলের হিসাব অনুযায়ী গভীর নিম্নচাপটির বাংলাদেশে সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগসংক্রান্ত একটি চলমান ব্যবস্থা হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। তার মতে, সিস্টেমটি যদি আরও শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়, তাহলে সেটি প্রথমে ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করে সেদেশের উপকূলেই আঘাত হানার সম্ভাবনা বেশি। তবে বাংলাদেশে সরাসরি আঘাত না এলেও এর প্রভাবে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সকালে সিস্টেমটি প্রায় ১৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের কাছে অবস্থান করছিল। পরে এটি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গভীর নিম্নচাপে পরিণত হলেও এ মুহূর্তে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া যাচ্ছে না। সিস্টেমটির গতিপথ ও শক্তি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বুধবার থেকে বাড়বে বৃষ্টি:
গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে বুধবার থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারি এবং কোনো কোনো এলাকায় অতিভারি বৃষ্টিপাতেরও আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে। ২৪ সেপ্টেম্বরও দেশের কয়েকটি বিভাগে বৃষ্টি ও ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বরের দিকে বৃষ্টির প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। এর আগে ২২ সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসেও রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও জানানো হয়।
কমছে তাপমাত্রা, প্রশমিত হচ্ছে তাপপ্রবাহ:
বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রাও কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহও ধীরে ধীরে প্রশমিত হচ্ছে। সোমবার দেশের ২০টি জেলায় তাপপ্রবাহ থাকলেও মঙ্গলবার তা রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী এলাকায় সীমিত ছিল। মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে রংপুরে, ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন সোমবার শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি এবং ঢাকায় ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। অর্থাৎ বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের তাপমাত্রায়ও কিছুটা স্বস্তি ফিরছে।
অযথা আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকার পরামর্শ:
আবহাওয়াবিদদের মতে, গভীর নিম্নচাপটির গতিপথ বর্তমানে বাংলাদেশের স্থলভাগের দিকে সরাসরি নয়। ফলে এ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় এলাকা এবং নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে নতুন সতর্কবার্তা বা নির্দেশনা আসতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত হালনাগাদ আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।









