বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা ও তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা চাইলেন রাষ্ট্রপতি

সময়: 10:00 am - September 30, 2026 |

মিজানুর রহমান:

বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে চীনের গঠনমূলক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।=সাক্ষাৎকালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এবং তাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য চীনের উদ্যোগ ও সহযোগিতা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। রাষ্ট্রপতি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে চীনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের আরও কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান হিসেবে মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে আসছে। =

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চীনের আরও বিনিয়োগ ও সহযোগিতা কামনা করেন রাষ্ট্রপতি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বৈদ্যুতিক যানবাহন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও সৌরশক্তিসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব খাতে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে চীনের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কুনমিং-চট্টগ্রাম করিডর এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরসহ বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক যোগাযোগের বিভিন্ন উদ্যোগকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতাও আরও বিস্তৃত হতে পারে। পারস্পরিক স্বার্থে বাংলাদেশ চীন ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও এ সময় উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি জানান। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পেও চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চলমান আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের অবদানের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এ সম্পর্ক আগামী দিনে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত হবে। রাষ্ট্রপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের চীন সফরের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর নিজের এবং বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতৃত্ব ও শিক্ষার্থীদের চীন সফরের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব সফর, বৈঠক ও পারস্পরিক যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বহুমাত্রিক হবে এবং পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ ও অর্থায়নে চীনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, চিকিৎসা দক্ষতা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ সময় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে জনগণের জন্য উন্মুক্ত জটিল ব্লাড ক্যান্সার চিকিৎসায় চীনা দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চান রাষ্ট্রপতি। জবাবে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে সাক্ষাতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদানের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ইয়াও ওয়েনের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদান বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে বলে উল্লেখ করেন। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব, প্রেস সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন। চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি চিফ অব মিশন ড. লিই ইউইন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, আঞ্চলিক যোগাযোগ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক যোগাযোগ হয়েছে। গত ৩০ আগস্টও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর