তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু
তাহের মাহমুদ:
উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিক প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মহাপরিকল্পনার মূল কাজ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করতে প্রায় ২৩ কোটি টাকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে প্রকল্পটির প্রাথমিক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তাব অনুমোদিত হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও নদীভাঙন সমস্যার টেকসই সমাধানের পাশাপাশি নদী ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, সেচ ও আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো। মহাপরিকল্পনার বড় পরিসরের কাজ শুরুর আগে প্রকল্পটির বিভিন্ন অবকাঠামো ও কার্যক্রমের কারিগরি সক্ষমতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল যাচাই করা হবে। এ জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ২৩ কোটি টাকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের প্রতিটি কম্পোনেন্টের বাস্তবায়নযোগ্যতা, ব্যয়, সম্ভাব্য সুফল এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হবে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। এর মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলোতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় তিস্তা নদীর প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও সংস্কারের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ২২৪ কিলোমিটার শক্তিশালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ এবং ওই বাঁধের ওপর পাকা সড়ক তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটতে পারে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাউবো) মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বাসসকে বলেন, সরকারের সমন্বিত এ পরিকল্পনা শুধু নদী রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সেচব্যবস্থায়ও নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত ২২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণ করা হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্ষায় নদীবেষ্টিত যেসব এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সেখানে এই বাঁধ একই সঙ্গে বন্যা প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নদীশাসনের মাধ্যমে নদীসংলগ্ন প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুনরুদ্ধার করা এসব জমি ভবিষ্যতে কৃষি ও শিল্পের কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি, পলি ব্যবস্থাপনা এবং উজান-ভাটির পানিপ্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। নদী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ বাসসকে বলেন, নদীর পলি ব্যবস্থাপনা ও গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রেখে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে এর সুফল পাওয়া সম্ভব। বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান বাসসকে বলেন, উজান ও ভাটির পানিপ্রবাহ এবং অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদীর মতো আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় প্রকল্পের অবকাঠামোগত পরিকল্পনার পাশাপাশি নদীর পানিপ্রবাহ, পলি, পরিবেশ এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম সাহাবুদ্দিন বাসসকে বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দিতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সমীক্ষার মাধ্যমে ব্যারেজ, নদীশাসন, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সংরক্ষণসহ প্রকল্পের বিভিন্ন কম্পোনেন্টের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতারও বাসসকে জানিয়েছেন, সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। অনুমোদন পেলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল উত্তরাঞ্চলের রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নদীটির সরাসরি প্রভাব রয়েছে। বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দীর্ঘদিন ধরে এসব অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সেচ, কৃষি, যোগাযোগ এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ১৭০ বর্গকিলোমিটার জমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষি ও স্থানীয় শিল্পের জন্য নতুন ভূমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণ হলে প্রত্যন্ত ও নদীবেষ্টিত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের রূপরেখা ও অঙ্গীকার তুলে ধরেন। এর পর প্রকল্পটির প্রাথমিক কার্যক্রমে গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে বড় পরিসরের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, কারিগরি নকশা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের সমীক্ষা ও পরামর্শক নিয়োগকে প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু নদী ব্যবস্থাপনা বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি, সেচ, ভূমি ব্যবহার এবং শিল্পায়নের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়েই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।









