দুর্গাপূজায় সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা, নেই বিশেষ ঝুঁকির তথ্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জিয়াউল হক টুটুল:
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের জন্য সারা দেশে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এবার দেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আয়োজিত সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, পূজা ফ্রন্ট, কল্যাণ ট্রাস্ট, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটিসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট এলার্ট বা বিশেষ ঝুঁকির তথ্য নেই। ফলে উৎসবমুখর পরিবেশেই এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। তবে পুরো উৎসবজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এবার সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। গতবারের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বেড়েছে। এর আগে দেশে ৩২ হাজার ৩৫১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারও আগের বছরগুলোতে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ হাজার। মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি প্রস্তুতি বৈঠকেও মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমা বিসর্জনসহ পুরো উৎসবের সময় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি তিন দিন করা হয়েছে। এর সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার যুক্ত হওয়ায় মোট পাঁচ দিনের ছুটি দাঁড়াবে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ছুটির সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের চলাচল বাড়বে। তাই উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত দেশের কোনো পূজামণ্ডপকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। তবে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকবে। কোনো ধরনের হুমকি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাতেও পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা, প্রতিমা বিসর্জন এবং গুজব মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদানের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগে ৪ কোটি টাকা সরকারি অনুদান দেওয়া হলেও এবার তা বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটি ও সংশ্লিষ্টদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্গাপূজার সময় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এর আগে নির্বাচনের সময় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করেছিল। এবার দুর্গাপূজার সময়ও এর মাধ্যমে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা পরিস্থিতির তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো সম্ভব হবে। জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর, বিভাগীয় ও জেলা পুলিশ পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল চালু থাকবে বলে জানান তিনি। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে যাতে পূজার আয়োজন ব্যাহত না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে। মণ্ডপ আয়োজকদের সার্বক্ষণিক জেনারেটর প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি জেনারেটর বিকল হলে অতিরিক্ত ব্যাকআপ হিসেবে রিচার্জেবল লাইট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। সব ধর্মের মানুষ যাতে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করতে পারেন, সে জন্য সরকার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করছে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন, ধর্ম বা বিভাজনের ভিত্তিতে নয়, নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দেশের প্রত্যেক মানুষ সমান অধিকার ও নিরাপত্তা ভোগ করবেন। সিলেট, মানিকগঞ্জ ও দিনাজপুরে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন খবরের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এসব ঘটনার কোনোটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন। মন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদ ও অন্যান্য অপরাধ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ নিয়মিতভাবে চাঁদাবাজ, সশস্ত্র অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা হালনাগাদ করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া মাটিকাটা ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় রাতে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর পুলিশের হস্তক্ষেপের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। মিথ্যা অভিযোগ প্রতিরোধে আনুষ্ঠানিক মামলা করার আগে আইনগতভাবে প্রাথমিক তদন্ত বা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মিরপুরে হকার ও পুলিশের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মধ্যে প্রাথমিক সমন্বয়ের অভাব থেকেই ঘটনাটি ঘটেছে। এ বিষয়ে সরকারি তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। রাড্ডা ও মানিকদিতে স্টুডিওতে হামলার ঘটনাও তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও অপরাধের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, কেউ কেউ সরকারকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করছেন। তবে কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য যাচাই করে দায়িত্বশীলভাবে মন্তব্য করা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের সব পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় উৎসব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।









