আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা শুরু,অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরবে বাংলাদেশ

সময়: 7:19 am - October 12, 2026 |
মিজানুর রহমান:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা শুরু হয়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে এবারের সভায় আলোচনা হচ্ছে। এতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। সভায় দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও বাস্তবতার আলোকে প্রণীত সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরবে বাংলাদেশ। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককের কুইন সিরিকিত জাতীয় সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। এবারের সভায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নিজস্ব সংস্কার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বাড়াতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেন, ব্যাংকক সভায় বাংলাদেশ নিজস্ব উদ্যোগে প্রণীত অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরবে। দেশের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সরকার নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে দেশের বাস্তবতা ও নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সরকারের এ অবস্থানের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং সংস্কার কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা। এ জন্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। বার্ষিক সভার ফাঁকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের সুযোগ রয়েছে। এসব আলোচনায় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, উন্নয়ন অর্থায়নের চাহিদা এবং সংস্কার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে আইএমএফের সঙ্গে ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, করব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধির মতো বিষয় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। এ ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও নীতিগত অবস্থান তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হবে।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারের ভূমিকা বাড়ানোও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি দেশীয় সম্পদ আহরণ এবং বেসরকারি পুঁজি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে উন্নয়ন অর্থায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।বিশ্বব্যাংকের এবারের সভার কর্মসূচিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য শুধু ঋণ ও আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেবল ঋণ বা আর্থিক সহায়তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা জোরদার করা এবং বিনিয়োগ ও উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও এ সভা গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার বজায় রেখে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে পারলে তা দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ব্যাংককের এ সভায় বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের চাহিদা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কী ধরনের সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হয়।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর