শীতের আগেও ভয়ংকর ডেঙ্গু, প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ

সময়: 7:39 am - October 17, 2026 |

মানব কথা ডেস্ক:

শীতের আগমনি বার্তা প্রকৃতিতে। একসময় বর্ষা শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে শুরু করলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বছরের শেষ প্রান্তে এসেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না এডিস মশাবাহিত এ রোগ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৮১ জন। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ১৭৯ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুকে কেবল বর্ষাকালের রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রার পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে বছরের বিভিন্ন সময়েই সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে শীত আসছে বলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবেশ, তাপমাত্রা ও মশার প্রজনন পরিস্থিতির কারণে বছরের বিভিন্ন সময়েই সংক্রমণ চলতে পারে। তাই শীতের শুরু হয়েছে বলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমে যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সারা বছর কার্যকর কর্মসূচি চালাতে হবে। পাশাপাশি রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদার করা জরুরি। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; কোথায় মশা জন্মাচ্ছে, তা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বে-নজির আহমেদের মতে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কমানো কঠিন হবে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক নজরদারি ও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বছরের শেষ দিকে এসেও বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে এবং রোগীরা কখন চিকিৎসা নিতে আসছেন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; বরং নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগই সংক্রমণ কমাতে সহায়ক হতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জন। এ সময়ে রোগটিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩৫ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তুলনায় ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর জটিলতা এড়াতে দ্রুত রোগ শনাক্ত, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৮১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ১৭৯ জন। নতুন রোগীর পাশাপাশি আগে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ ও জটিলতা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রোগী ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি অব্যাহত রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সংক্রমণপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক উদ্যোগ জরুরি। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা, অব্যবহৃত টায়ার ও পাত্র সরিয়ে ফেলা এবং পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা এডিস মশার প্রজননস্থল কমাতে সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ি ও আশপাশের সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরীক্ষা করা উচিত। তবে শুধু নাগরিকদের সচেতনতার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে চলবে না। নগরসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং গৃহীত ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, সঠিক মাত্রা ও কার্যকারিতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সেই উদ্যোগে কতটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে—তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজে থেকে ওষুধ সেবন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, জ্বর কমে যাওয়ার পরও ডেঙ্গু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই জ্বর কমলেই ঝুঁকি কেটে গেছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে বছরজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর নজরদারি, দ্রুত চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বর্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে সারা বছর পরিকল্পিত প্রতিরোধ কার্যক্রম চালানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর