বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ, ব্যাংকিং লেনদেনে কতটা প্রভাব?

সময়: 3:25 pm - October 23, 2026 |

জিয়াউল হক টুটুল:

বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্তও সাইটটি বন্ধ রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও দেশের ব্যাংকিং লেনদেন ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণের পর এটি পুনরায় চালু করা হবে। ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে সেবাটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার একটি বার্তা দেখা যাচ্ছে। দ্রুত ওয়েবসাইট চালু করার কথা জানানো হলেও নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে জানান, বৈশ্বিকভাবে সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকও একই ধরনের নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি টিম নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ওয়েবসাইট চালু করতে চায় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাংকিং লেনদেন, টাকা জমা, উত্তোলন কিংবা অর্থ স্থানান্তরে সরাসরি কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, তাদের ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ও লেনদেনে কোনো সমস্যা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও জানিয়েছেন, ব্যাংকিং লেনদেন চালু রয়েছে। তবে লেনদেনের গতি কিছুটা কমেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্যাংকের সাধারণ ওয়েবসাইট এবং অর্থ লেনদেন পরিচালনার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মূলত বিভিন্ন নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন, অর্থনৈতিক প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে ব্যাংকের গ্রাহকদের লেনদেন পরিচালিত হয় পৃথক কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট মূলত তথ্য প্রকাশের মাধ্যম। এর সঙ্গে সরাসরি অর্থ লেনদেন ব্যবস্থার কোনো সংযোগ নেই। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেনও একই মত দিয়ে বলেন, ওয়েবসাইট বন্ধ হলেই ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। ব্যাংকের মূল লেনদেন পরিচালিত হয় আলাদা ও সুরক্ষিত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায়।

বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ওয়েবসাইট তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশ করতে পারে। এমনকি ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তথ্য পরিবর্তন, বিকৃত করা কিংবা সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেন বলেন, কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হলে হ্যাকাররা সেখানে নিজেদের পছন্দমতো ছবি, বার্তা কিংবা তথ্য প্রদর্শন করতে পারে। তবে সাধারণ ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া মানেই গ্রাহকের অর্থ বা লেনদেনের তথ্য ঝুঁকিতে পড়া নয়।কারণ, ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সাধারণত প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি, বার্ষিক প্রতিবেদন ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্য থাকে। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ এবং পরিচালনার জন্য পৃথক কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইট বন্ধ:

সাইবার হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে অফলাইনে নিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষা, সফটওয়্যার হালনাগাদ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার করা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি পদ্ধতি। খালিদ হোসেনের মতে, সম্ভাব্য হামলার উৎস সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার কাজ করা প্রয়োজন। শুধু সফটওয়্যার আপডেট করলেই হবে না, সেটি পরীক্ষা ও পুনরায় কার্যকর করার আগে নিরাপত্তা যাচাইও জরুরি। বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। তবে প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা জানতে বিস্তারিত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

আগেই সতর্ক করা হয়েছিল ব্যাংকগুলোকে:

সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে এর আগেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছিল। গত ১৯ অক্টোবর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের জারি করা এক পরিপত্রে নিয়মিত নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাই, সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সাইবার হামলা মোকাবিলায় বিশেষায়িত দল গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ সংরক্ষণ, অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য হামলার পর দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি রাখার কথা বলা হয়।বৃহস্পতিবার সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টও পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সতর্কতা জারি করে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইটগুলো দ্রুত নিরাপত্তা আপডেট করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আপডেট তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব না হলে বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।

বিশ্বজুড়েই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ:

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিয়ে তৎপর হয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা ত্রুটির প্রযুক্তিগত বিবরণ প্রকাশ্যে আসায় আগামী দিনগুলোতে এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলার চেষ্টা বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় আপাতত সাধারণ ব্যাংকিং লেনদেনে বড় ধরনের প্রভাব না পড়লেও বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওয়েবসাইট সুরক্ষিত রাখলেই চলবে না; ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক, তথ্যভান্ডার, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য এবং লেনদেন ব্যবস্থার নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর