বিতর্কিত লটারীতে স্থবির গণপুর্তবিতর্কিত লটারীতে স্থবির গণপুর্ত, চার মাসধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে অচলাবস্থা কাটছেই না

সময়: 5:05 am - October 25, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গত ৩০ জুলাই ২০২৬ রোজ বৃহস্পতিবার, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পূর্ত ভবনের সম্মেলনকক্ষে লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। লটারীতে উপসহকারী (সিভিল) পদের কর্মকর্তাদের আটটি বিভাগে নিজ জেলা ব্যতীত তার বিভাগের অন্য জেলায় বদলী যোগ্য করে কেটাগরি নির্ধারন করার কথা বলা হলেও তাতে শুভঙ্করের ফাকি ছিল। যেমন কেপিআই এর নাম করে ঢাকার বেশ কয়েকজনকে আবার ঢাকায় ই রেখে দেয়া হয়েছে। আবার আগে থেকে ঠিক করে রাখা অফিসারদের নিজ নিজ বিভাগের বাক্সে না রেখে বিভাগীয় পদ পূরন হয়ে যাবার পরে ঢাকার বাক্সে ফেলে লটারী করে ঢাকায় রাখা হয়েছে। আবার ৮ দিন আগে বদলী হয়ে আসা কর্মকর্তাকেও বদলী করা হয়েছে। কেপি আই হিসাবে ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগ ও নগর গণপূর্ত বিভাগের কাউকে লটারীর আওতামুক্ত আবার কাউকে ঢাকার বাহিরে পাঠানো হয়েছে। যাদের ঢাকার বাহিরে পাঠানো হয়েছে তাদের অযোগ্যতা বা অপরাধ কি তা কেউ জানেনা। এরকম বিশেষ ক্যাটাগরীতে লটারী করে গোপালগঞ্জের কৃতী (!) সন্তান শ্রী নিমিতোশ ওঝাকে গুলশানে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রধান প্রকৌশলীর স্মারক নম্বরঃ ২৫.৩৬.০০০০.২১৬.১৯.০০২.২৬-১৩৭; তারিখঃ২/০৮/২০২৬ খ্রিঃ জারিকৃত বদলী আদেশে (১৩ নম্বর ক্রমিকে) তাকে ঢাকার রক্ষনাবেক্ষণ উপবিভাগ, শাখা-১ এই পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে গণমাধ্যমে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন। আবার দুই মাসেরও কম সময়ে পি আর এল এ যাবেন এমন বয়স্ক কর্মকর্তাকে তিনি যেখান থেকে পেনশন পেতে চান সেই জেলায় না রেখে ঢাকায় বদলীর মতো অবিবেচক ও অমানবিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আসলে সংস্থাপনে যারা আছেন তাদের ডেটা বিশ্লেষনের ক্ষমতা কোন পর্যায়ের তা প্রশ্ন থেকেই যায়। কিংবা আদৌকি তারা কোন কাজ করেন না কেরানীদের দায়িত্বদিয়ে নিজেরা টাকা গুনতে ব্যস্ত থাকেন। কোটিপতি ক্লাবের সহকারী প্রকৌশলীরা ঢাকায় বহাল তবিয়তেঃ একইভাবে ১৭ আগস্ট ২০২৬ লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৫২ জন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ও ৬৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে (ই/এম) বদলি করা হয়, একই দিনে ১৩৫ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) ও ৫৫ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে (ই/এম) বদলি করা হয়েছে অর্থাৎ মোট ৪০৯ জন প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এই লটারীতেও দালালের মাধ্যমে টাকা জোগাড় করা হয়েছে। ফলে কোটিপতি ক্লাবের সহকারী প্রকৌশলীরা ঢাকায় থেকে গেছেন বহাল তবিয়তে।

আতিকের ডাবল ধামাল দ্বিতীয় কিস্তিঃ ঢাকার এমনই কোটিপতি সহকারী প্রকৌশলীদের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এঁর সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আতিকুর রহমান। এই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা চাকুরী জীবনে কখনই ঢাকার বাহিরে যাননি। তিনি এর আগে তিন বছর মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগে ছিলেন। এরপরে আওয়ামীলীগ আমলে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এঁর সহকারী প্রকৌশলীর পোস্টিং পান।এরপরে রিজিম পরিবর্তন হলে তিনি তখনকার সমন্বয়কদের দুজনকে হাত করে টিকে যান। এই আতিকুর রহমান আবার আরবরি কালচার গণপূর্ত বিভাগেরও সহকারী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পালন করছেন, যেন তার চেয়ে গুণধর কাউকে এই তল্লাটে আর খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। অথচ তিনি ঘোষনা দিয়ে ঘুষ খান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি দরপত্রের চুক্তি করার সময় তাকে নূন্যতম ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়, না হলে তিনি চুক্তি না করে ফেলে রাখেন, দম্ভ ভরে বলে বেড়ান,” আপনি যেই হোন আর যার রেফারেন্সেই কাজ পান আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিতেই হবে, যার কাছে খুশি যেয়ে নালিশ করতে পারেন, আমি তোয়াক্কা করিনা।“ এই সুবাদে চলতি অর্থ বছরে দুই ডিভিশনের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জড়িত থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আতিক। লটারীতে তিনি শেরে বাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ ১ এ পোস্টিং পেয়েছেন, কোন ক্যাটাগরিতে? শুধু তাই নয় ফ্যাসিস্ট আমলের যেই নির্বাহী প্রকৌশলী তাকে ঢাকা ডিভিশন ২ তে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি আবার আতিককে দিয়ে শেরে বাংলা নগর ৪ এ অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বাহ! কি চমৎকার সব সময় তিনি ঢাকার দুটো ফিল্ড দখল করে থাকবেন। নবাব জাদাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দিয়ে দিলেই তো হয়, নব্য লর্ড কর্ণ-ওয়ালিশ তো ভালোই খাজনা পেয়েছেন মনে হয়।

এছাড়া সহকারী প্রকৌশলী প্রান্ত বিশ্বাস, ইডেন ভবন গণপূর্ত সহকারী প্রকৌশলী নাজমুস সাকিব, নগর গণপূর্ত বিভাগের সপ্নীল ঘুরে ফিরে ঢাকার ফিল্ডেই রয়েগেছেন। যা লটারীর প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন বিদ্ধ করে। ঢাকার কোটিপতিক্লাবের প্রভাবশালী উপবিভাগীয় প্রকৌশলীরাও রয়ে গেছেন ঢাকার মধ্যেই। এর মধ্যে ৩৪ বিসিএস এর এক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী যিনি চাকুরী জীবনে কখনও ঢাকার বাহিরে যাননি তিনি আবার ৫০০ কোটি টাকার কাজ রয়েছে এমন জায়গায় বদলী হয়েছেন, তিনি এর আগে ঢাকা ডিভিশন ১ , ঢাকা উপবিভাগ-৫, নগর গণপূর্ত উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। বুয়েট ২০০৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। মগবাজারে তাদের আত্মীয় স্বজন চৌদ্দ গুষ্টি আওয়ামীলীগের সাথে জড়িত। শামীম আখতারের স্টাফ অফিসার মাহাফুজ আলম(২২ তম বিসিএস, বর্তমানে ত্বত্তাবধায়ক প্রকৌশলী) এর সাথে সক্ষতার জোরে সে সময় মিডিয়া সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করতেন। মাহাফুজ নিজেও ছাত্রলীগ নেতা ও তারা দুজনেই বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা। এই ক্ষমতাধর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী দালালীর একজন ক্যাশিয়ার। তার মাধ্যমে তার বন্ধু রাশেদ আহসান লেনদেন করেছেন মর্মে জানা যায়।

আওয়ামী মন্ত্রী শম রেজাউল করিমের ভাগিনা, আনম মাজহারুল ইসলাম (নির্বাহী প্রকৌশলী সংস্থাপন-১) এর লবিং এ ঢাকা উপবিভাগ-৫ এ পোস্টিং পেয়েছেন অসীম চন্দ্র স্বর্নকার। অসীম চন্দ্র আগে মাজাহারের অধীনে রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগে উপসহকারী প্রকৌশলী ছিলেন, দুজনের বাড়িই আবার বরগুনা। এই অসীম চন্দ্র বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশল পরিষদের নেতা। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল করতে গেলে পুলিশের আঘাতে তার হাতের একটি আঙ্গুল কেটে যায়। তাছাড়া তার ভারতীয় নাগরিকত্ব রয়েছে মর্মে জন শ্রুতি রয়েছে। ফ্যাসিস্টের সুবিধা ভোগী মজাহার এর ইসকন কানেকশন, শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব-১ কাজী নিশাত রসুল এর ঘনিষ্ঠতা, মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন ,দূর্নীতির টাকায় অস্বাভাবিক বিলাসী জীবন ইত্যাদি নিয়ে ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে অকাট্য প্রমান সহ খবর বেরিয়েছে। নিজে লটারীর ক্যাটাগরি নির্ধারনের দায়িত্বে থেকে আবার নিজেই ঢাকায় পোস্টিং এর বিশেষ গ্রেডে জায়গা করে নিয়েছেন। ফলে এইসব গ্রেডিং এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের টেন্ডার করে কোটি কোটি টাকার মালিক হতে তিনি শিউর শট শেরে বাংলা নগর ২ এ পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন। তার পর না হয় আরেক বার হজ্জ্ব করে এসে সাধু সেজে বসে থাকবেন।

নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারী ঘিরে বিতর্কঃ ১৩ আক্টোবর ২০২৬ (মঙ্গলবার ) দুপুরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের সভাকক্ষে সরাসরি লটারীর মাধ্যমে বদলী করা হয় ১৫৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলী পদের কর্মকর্তাকে। এই লটারীতে কত গূলো নির্দিষ্ট বাক্সে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে কোন ধরনের জেলায় দেয়া হবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। প্রকৌশলীদের এই কেটাগরী করার মানদন্ড কি আর কাকেই বা সেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা নিরপেক্ষভাবে বক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে ক্যাটাগরি নির্ধারন করেছেন কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফলে লটারীর উদ্দেশ্য যাই থাকুক তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেমন সংস্থাপনের দুই নির্বাহী প্রকৌশলী আনম মাজহারুল ইসলাম ও জিয়া যথাক্রমে শেরে বাংলা নগর ২ ও ১ এ উঠা কি শুধুই কাকতাল। জিয়া কোন যোগ্যতায় টপ টুয়েন্টি কেটাগরিতে পড়েন? এই জিয়া ফ্যাসিস্টের আমলে ঠিকাদারের সাথে পার্সেন্টেজ নিয়ে মারামারি করে ওএসডি হয়ে ভবনে পড়ে থাকেন। ঠাকুরগাঁও গণপূর্ত বিভাগ চালাতে না পারা এই অচল মাদুই বছর রিজার্ভে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এসময় ভোল পাল্টে টাখনুর উপর প্যান্ট মাথায় টুপির লেবাস ধরেছেন। পরে সংস্থাপন এ গিয়ে বিতর্কিত নিয়োগ বাণিজ্য করে ভাল কামিয়েছেন। অথচ ২৭ বিসিএস এ প্রথম স্থান অধিকারি জনাব মহসীন কোন দিন ঢাকায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে চাকুরি করেনন নি, নৈতিকতা ও সততার মানদন্ড হোক কিংবা কারিগরি দক্ষতা কোন দিক থেকেই তিনি ৩৩ বিসিএস এর মাসুম বিল্লাহএর থেকে কম যোগ্যতা সম্পন্ন নন। অথচ তিনি কুষ্টিয়া থেকে ফেনী গেলেও, আজীবন ঢাকায় চাকুরি করা দূর্নীতির বরপুত্র মাসুম বিল্লাহ ৬ মাসের মধ্যে আবার ঢাকায় ঢুকে পড়েছেন।

চিহ্নিত দূর্নীতিবাজকে লটারীর বাহিরে রেখে সন্তর্পনে বদলীঃ এই লটারীর ডামাডোলের মধ্যেই ১৫ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিঃ , ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৩.২৪-১৪৬৮ স্মারকে খুব সন্তর্পনে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ ৫ এ ঢূকে পড়েন কুয়েটে ছাত্রলীগ নেতা আশরাফ উদ্দিন রিজু। গাজীপুরে তার সীমাহীন দূর্নীতি, কাজ না করে অর্থ আত্মসাদের গুরুতর অভিযোগ থাকায়, ভোলা গণপূর্ত বিভাহে থাকা কালীন ওএসডি হন। বঙ্গবঙ্ঘু প্রকৌশল পরিষদের এই নেতা ওবায়দুল মুক্তাদিরকে চার কোটি টাকা দিয়ে গাজীপুরে পোস্টিং নিয়েছিলেন। আওয়ামীলীগের ক্যাডার নিয়োগের ২০০ মার্কের এমসিকিও উত্তীর্ণ হয়ে ক্যাডার বনে যাওয়া ৩২ তম বিসিএস এর এই ছাত্রলীগ নেতা একজন গুরুত্ব পূর্ন ব্যক্তির পিএস এর নাম ব্যবহার করছেন।কিন্তু বাজারে জোর গুঞ্জন আছে আশরাফের এই লেনদেনটা প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার মোস্তাফিজ করে দিয়েছেন। আশরাফুদ্দিন রিজুর বিরুদ্ধে দূদকে একাধিক মামলা ও তদন্ত চলমান আছে। প্রকৌশলীদের ভাগ্য নির্ধারিত হয় হাজী হাসানের উত্তরার বাসায়ঃ লটারী হোক বা তার পূর্ববর্তী বদলী, ঘুরে ফিরে সকল মিডিয়ার দুই সারোয়ারের নাম এসেছে। বিশেষত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) সারোয়ার আলমের নাম এসব বিতর্কের সাথে বেশি মাত্রায় গণমাধ্যমে আসছে। কিন্তু মাস্টার মাইন্ড স্বপন চাকমা ধরা ছোয়ার বাহিরে থেকে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে আবার দারুন যোগসূত্র আছে। এরা দুজনেই গাজীপুরে চাকুরি করেছেন। সারোয়ার আলম যখন গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী, স্বপন চাকমা তখন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী। স্বপন চাকমা দীর্ঘদীন গাজীপুরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং পরে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। সেই সুবাদে গাজীপুরের ঠিকাদার হাজী হাসানের সাথে তার দহরম মহরম রয়েছে। হাজী হাসানের উত্তরার ১ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়িটি আসলে আমলা, প্রকৌশলীদের রং মহল। বিগত ফ্যাসিস্টের ১৭ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুর্ত মন্ত্রনালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আমলার রুমের সামনে অবাধ বিচরন ছিল লম্বা আলখাল্লা পরিহিত শুভ্র দাড়িমন্ডিত এই হাজী হাসানের। দীর্ঘদিন ধরে স্বপন চাকমা এই রংমহলে আমলাদের হানি ট্র্যাপ করে নিজেকে লেনদেনে অপরিহার্য করে রেখেছেন। ফলে সব সময়েই অধিদপ্তরের কলকাঠি তার হাতেই থাকে। তিনি শেখ হাসিনার কবির চাচা খ্যাত কাবিকো ইন্টারন্যাশনাল এর কর্ণধার শেখ কবির এর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে অপ্রতিরোধ্য ছিলেন, ফলে রাত বিরুদ্ধে দূর্নীতির প্রমানিত তথ্য থাকার পরেও তিনি তর তর করে উপরে উঠে গেছেন।

স্বপন চাকমার মতো দূর্নীতিবাজ করেন প্রকৌশলীদের গ্রেডিং-এ যেন শিয়ালের কাছে মুরগী বর্গা দেয়াঃ

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ প্রকল্পে দূর্নীতঃ এই প্রকল্পে স্থাপনা নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নে ৫৪২ কোটি ৮৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. মনিরুজ্জামান ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে বালু ভরাট না করেই ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সাড়ে ছয় কোটি ও ভেরিয়েশনের নামে গাজীপুর গণপূর্তের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন চাকমা হাতিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকার বেশি। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই ফাটল ধরে অবকাঠামোগুলোয়। এ ছাড়া ২৭ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় কার্যাদেশ বাতিল, বিল পরিশোধ না করায় প্রকৌশলী স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে গাজীপুর যুগ্ম জজ প্রথম আদালতে মামলা করেন এস এইচ জয়েন্টভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মো. মোনায়েম কবির। তিন কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার টাকায় বালু ফেলে প্রথম পর্যায়ে ভূমি উন্নয়নের কাজ পেয়েছিলেন তিনি। ভূমি উন্নয়ন খাত থেকে ৬.৫ কোটি এবং কাশিমপুর কারাগারের পার্ট-২ ভেতরে আরসিসি সড়ক মেরামত না করে ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন তিনি স্বপনের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদকে লিখিত অভিযোগ দেয় জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি। অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ৩ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে (স্বাস্থ্য উইং) অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে দুদকও অনুসন্ধান শুরু করেছে। এসএইচ জয়েন্টভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মোনায়েম কবির বলেন, তিনি চূড়ান্ত বিল দাখিল করার পর স্বপন চাকমা তাঁর কাছে ২৭ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। তা দিতে না চাইলে ‘সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা হয়নি’ কারণ দেখিয়ে তাঁর কার্যাদেশ বাতিল করেন। বাধ্য হয়ে মোনায়েম স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি গাজীপুর যুগ্ম জজ প্রথম আদালতে অর্থ আদায়ে মামলা করেন। সূত্র জানায়, দরপত্রে দ্বিতীয় পর্যায়ে ভূমি উন্নয়নকাজে বালু ভরাটের গড় গভীরতা ছিল ১৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। মাত্র তিন থেকে চার ফুট বালু ফেলে ভবন নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এতে ফিনিশড গ্রাউন্ড লেভেল (এফজিএল) নকশা অনুযায়ী হয়নি। কিন্তু ১২ ফুট বালু ভরাট দেখিয়ে ১২ কোটি টাকা বিল তুলে নেওয়া হয়। ওই বিল থেকে স্বপন চাকমা একাই নেন সাড়ে ছয় কোটি টাকা। বালু কম ফেলায় হাসপাতাল ভবনের চেয়ে একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, ডরমেটরি ভবন প্রায় ১০ ফুট নিচু হয়। তোপের মুখে পড়লে স্বপন তড়িঘড়ি হাসপাতাল থেকে একাডেমিক ভবনে যাতায়াতের করিডর নির্মাণ করেন। যে স্থানের ওপর দিয়ে করিডর নির্মাণ করা হয়েছে সেটি মূল নকশায় ছিল খেলার মাঠ। নাম না প্রকাশের শর্তে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষক বলেন, প্রতিটি ভবন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই ভবনগুলোর দেয়াল এবং ভেতরের সিসি সড়ক ও ড্রেনে ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে সিসি ঢালাই সড়ক ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ফাটল ঢাকতে সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।

কাশিমপুর কারাগার প্রকল্পে দূর্নীতিঃ বালু ভরাট না করে সাড়ে ছয় কোটি এবং কাশিমপুর কারাগার (পার্ট-২) অভ্যন্তরে আরসিসি রাস্তা মেরামতের ৬৫ লাখ টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগে স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করে গাজীপুর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি। অভিযোগ আমলে নিয়ে স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বালু ভরাট না করে সাড়ে ছয় কোটি এবং গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে কাশিমপুর কারাগারের কাজ না করে রাস্তা মেরামতের ৬৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলাদা তদন্ত শুরু করেছে। দুদকের গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা সাগর কুমার সাহা বলেন, স্বপন কুমার চাকমার দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান শেষ হলে প্রতিবেদন কমিশনে পাঠানো হবে। দুদকের মামলায় দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞাঃ ২০১৯ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নয়জন প্রকৌশলী এবং দুই মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তাসহ ১১ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গ্রেপ্তার হওয়া ঠিকাদার জিকে শামীমের সঙ্গে যুক্ত থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। ৩০ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর চিঠি পাঠায় দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। যাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে, ৬ নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন চাকমা, মোহাম্মদ শওকত উল্লাহ, মোহাম্মদ ফজলুল হক, আব্দুর কাদের চৌধুরি, মো. আফসার উদ্দিন ও মো. ইলিয়াস আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মোমেন চৌধুরী ও মো. রোকন উদ্দিন এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রধান মুমিতুর রহমান এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে মমিতুর রহমান এক সময় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন (তথ্য সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো; ৩০/১০/২০১৯)। কেসিনো কান্ডে জিকে শামীম গ্রেফতার হলে তার সঙ্গে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে ফেসে যান ১২ জন প্রকৌশলী। ফলে তাদের সকল ব্যাংক একাউন্ট লেনদেনের তথ্য তলব করে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট। মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ। কারও অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হলে সে তথ্য খতিয়ে দেখে বিএফআইইউ। এছাড়া সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কারও তথ্য চাইলে বিএফআইইউর মাধ্যমে তার অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়ে থাকে (তথ্য সূত্রঃ সমকাল ২৭/১১/২০১৯)।

মুজিব বর্ষে হরিলুটঃ রোকনোদ্দিন প্রমোশন পেয়ে গেলে, সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এর আস্থাভাজন হিসাবে তাকেই শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ পোস্টিং দেয়া হয়। মুজিব বর্ষ উদযাপনের নামে করোনা মহামারি ও মন্দা অর্থনীতির মধ্যেও ৩২০ কোটি টাকা তার হাত দিয়েই খরচ হয়েছে। পরীক্ষায় ফেলের রেকর্ডঃ দশ বারের চেষ্টায় পিএসসিকে ম্যানেজ করে এই আদু ভাই পেছন দরজা দিয়ে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা পাস করেন, তাও তার হাটুর বয়সী নাতি পুতিদের সঙ্গে। সংস্থাপনের নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতিপান ২০২৫ সালে। পদোন্নতি পেয়ে সংস্থাপনেই তত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে বসেন। এই সময়ে মধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যপক নিয়োগ ও তদবীর বানিজ্যের অভিযোগ আসে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে গণপূর্ত অধিদপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর প্রায় সাড়ে চারশত পদে নিয়োগে জনপ্রতি সতের লক্ষ টাকার লেনদেন হয়েছে তার একক নিয়ন্ত্রনে। আবার উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে গণহারে বদলীতেও তিনি কলকাঠি নেড়েছেন। নিয়োগ বানিজ্য শেষ করে তিনি আবার চলে গেছেন সমন্বয়ে । মূলত এখান থেকেই মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনের বাজেট চূড়ান্ত করা হয়। তাছাড়া থোক এর টাকা নিয়ন্ত্রন করেন তিনি। তাকে যারা ১০ পার্সেন্ট টাকা দেন তারাই থোক বরাদ্দে অগ্রাধিকার পান মর্মে জন শ্রুতি আছে। একথা সচেতন কোন নাগরিকের অজানা নয় সকল চাকমা দেরকে ভারত নাগরিকত্ব দিয়ে রেখেছে। সে হিসাবে স্বপন চাকমা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভারতীয় নাগরিক এবং তারা অবাধে ভারতে যাতায়াত করে অর্থপাচার করে থাকে।আওয়ামী ফাসিবাদের ১৫ বছর, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর, কিংবা নব নির্বাচিত বিএনপি সরকার তিনি আছেন সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে। টেণ্ডার বানিজ্য, নিয়োগ -বদলী বানিজ্য সব কিছুতেই তার কালো হাতের থাবা,অথচ তিনি থাকেন অধরা।
ট্যাগিং এর রাজনীতিঃ এই চিহ্নিত দূর্নীতিবাজ, আওয়ামীলীগের দোসররাই যদি গ্রেডিং এর নামে সার্টিফিকেট দেয় তা কোন ভাবেই গ্রহন যোগ্য নয়। ছাত্রজীবনে কোন দিন ছাত্রলীগ করেননি এমনকি পেশাগত জীবনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য নন, এমন অরাজনৈতিক যোগ্য কর্মকর্তাদের ফ্যাসিস্ট এর দোসর ট্যাগ দিয়ে নিবর্তন মূলক পোস্টিং দেয়া হয়েছে। দূর্নীতির কোন অভিযোগ প্রমানিত না হলেও বেছে বেছে উইচ হান্টিং এর মাধ্যমে সিন্সিয়ার কর্মকর্তদের নৈতিকতাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করা হয়েছে দূর্নীতিবাজ তকমা দিয়ে। অথচ একাধিকবার ছাদ ভেঙ্গে পড়া দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অদক্ষ কর্মকর্তা সেরা ২০ এর ক্যাটাগরিতে ঢাকায় পোস্টিং পেয়েছেন। যেখানে শিষ্টের দমন আর দুষ্টের লালন নীতি প্রচলিত সেখানে ভালো ও দক্ষ কর্মকর্তারা নিরাশ ও কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলছে। নিরপেক্ষতাহীন এই বৈষম্যের লটারীকে, সিলেকশন বলাই শ্রেয়। বিগত জুলাই থেকে উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত ঢালাও বদলীর ফলে চার মাসের দীর্ঘ একটি শূন্যতা তৈরী হয়েছে। দেশ জুড়ে কারাগার, সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ লাইন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নৈমিত্তিক সেবা ব্যহত হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পেও একযুগে সকল উপসহকারী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী একযোগে বদলী হলে কাজ সুয়াপ্রভিশন ও কাজের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। অর্থ বছরে বাকি আছে আর মাত্র ৬ মাস। এর মধ্য রোজা ও দুই ঈদে লম্বা সময় লেবার সংকটে উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকে ফলে এডিপির লক্ষ্য অর্জনে এই ঢালাও বদলী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বৈকি।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর