আ.লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
মানব কথা ডেস্ক:
গোপন সমঝোতার অভিযোগ দুই পক্ষেরই, প্রকাশ্যে আসেনি অকাট্য প্রমাণ | দোষারোপের রাজনীতিতে লাভবান হতে পারে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতা ও রাজনৈতিক সখ্যের অভিযোগ ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সরকারি দলের অভিযোগ, দেশকে অস্থিতিশীল করতে বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, রাজনৈতিকভাবে তাদের কোণঠাসা করতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে ক্ষমতাসীনরা। তবে দুই পক্ষের এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত অকাট্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্য এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা। অন্যথায় পারস্পরিক দোষারোপের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনে একসময় পাশাপাশি থাকা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলছে। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—নিষিদ্ধ দলটির সঙ্গে কোনো পক্ষের সত্যিই সমঝোতা রয়েছে, নাকি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতেই আওয়ামী লীগ ইস্যুকে সামনে আনা হচ্ছে? বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সরকারের প্রতি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রশ্নে শুরু থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনায় সরব হয় বিরোধী দল। সরকারের মেয়াদ সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিরোধী দল লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু করে। এসব কর্মসূচিতে সরকারবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি সরকার পতনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা না করার ঘোষণাও দেন। এরই মধ্যে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন, ভাতা ও মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন জোরালো হয়েছে। এসব আন্দোলনের পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করছে সরকারি দল। তাদের দাবি, সরকারকে চাপে ফেলতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের যোগাযোগ বা সমঝোতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের অভিযোগ, বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তাদের ভাষ্য, বিরোধী মত দমনে পরিকল্পিতভাবে ‘আওয়ামী জুজু’ সামনে আনা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের প্রসঙ্গ তুলে আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।…কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতটা দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা জনগণের কাছে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে। এই দুপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অর্থ সরবরাহ এবং দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরিতে অন্য একটি রাজনৈতিক পক্ষের ভূমিকার অভিযোগ উঠে আসে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গত বুধবার রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দলটি আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, শ্রমিকদের দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে মেনে নেওয়া উচিত। পরদিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর আরেক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে রিজভী আরও বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও একটি ‘গুপ্ত দল’ অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। পরাজিত শক্তি ও ওই দলের আচরণ এবং কথাবার্তায় মিল রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তবে উভয় পক্ষের অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, যার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি বা জামায়াতের গোপন সমঝোতার দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়। বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দুই দলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে টানার অভিযোগ উঠেছিল।
সে সময় বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক নেতাকর্মীদের ছাড়াতে তদবিরের অভিযোগ সামনে আসে। বিভিন্ন নির্বাচনি জনসভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দেওয়া এবং কোথাও কোথাও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলোর সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। নির্বাচনের পর দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবরও পাওয়া যায়। কোনো কোনো ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতির কথা উঠে আসে। পরে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ও জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এসব কার্যালয় ভাঙচুর করে তালাবদ্ধ করে দেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের কয়েকজন কারাবন্দি নেতাকর্মীর জামিনে মুক্তি এবং আত্মগোপনে থাকা কারও কারও প্রকাশ্যে আসার ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় আসে। তবে এসব ঘটনা এককভাবে কোনো দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গোপন সমঝোতার অকাট্য প্রমাণ নয়। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং দেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোকে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। এসব ঘটনার পর সরকার গোয়েন্দা নজরদারি ও গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা বলেছেন। তাই এ বিষয়ে প্রমাণক তুলে ধরে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকলে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সুযোগ খুঁজতে পারে। এতে সরকারের উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই শিক্ষাবিদের মতে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্যের সুযোগে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠলে তা কারও জন্যই ভালো হবে না। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উভয় পক্ষেরই পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে কতটা গভীর ও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে বিষয়টি রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের কাছ থেকেই এ ধরনের বক্তব্য আসছে বলে তিনি মনে করেন। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে এই বিশ্লেষক বলেন, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত গোষ্ঠীই সুবিধা পেতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই দুই পক্ষের সংযত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সরকার যদি সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোনো অভিযোগ করে, তাহলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা সামনে আনা প্রয়োজন। একইভাবে বিরোধী দলেরও নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া উচিত। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বদলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।









