বিএফআইডিসিতে হরিলুট: রাবার চুরি ও চাঁদাবাজির হোতা বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতা নুরুল কবির
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফআইডিসি) ভাবমূর্তি নষ্ট, আর্থিক অনিয়ম, রাবার চুরি এবং অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির এক সহ-নিরীক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম জনাব নুরুল কবির। তিনি বিএফআইডিসিতে কর্মরত বঙ্গবন্ধু গবেষণা ও সমন্বয় পরিষদের বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। গত ০৩ জুন ২০২৬ তারিখে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি দায়ের করেছেন কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত সহ-ব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) মোঃ ফজলুল হক।
রাবার পাচার ও লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য:
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩১ মে ২০২৬ তারিখে কর্ণফুলী রাবার বাগান থেকে আনুমানিক ২৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ টন রাবার কারখানার সীমানা পেরিয়ে পাচার করা হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জানাজানি হলেও, অডিট কর্মকর্তা নুরুল কবির প্রায় ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুরির মূল হোতা ছিলেন সাব্বির জামান রাসেল এবং বিজন কুমার ভৌমিক। বাগান ব্যবস্থাপকের অনুপস্থিতি ও যোগসাজশের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, নুরুল কবির অর্থের বিনিময়ে তাকে স্বপদে বহাল রেখেছেন এবং সাব্বির জামান রাসেলকে চট্টগ্রামে লুকিয়ে রেখেছেন। অডিটের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে নুরুল কবিরকে একজন “দুর্নীতিবাজ কর্মচারী” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি শিল্প ইউনিটের ম্যানেজারদের অডিটের ভয় দেখিয়ে প্রতিমাসে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়াও, তার বিরুদ্ধে নাশকতার মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি তারিখে মতিঝিলে বিএফআইডিসির সদর দপ্তরের তৃতীয় তলায় তিনি আগুন লাগিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করা।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্তদের ফাইল গায়েব ও অর্থ আত্মসাৎ:
নুরুল কবির কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটে জড়িত হিসেবে ব্যবস্থাপক (হিসাব) ফৌজিয়া জাফরীন এবং সিএমপি মিরপুরের সহ-হিসাব কর্মকর্তা জহুরুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধু গবেষণা ও সমন্বয় পরিষদের কমিটিতে ফৌজিয়া জাফরীন সহ-সভাপতি এবং জহুরুল ইসলাম নির্বাহী সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
তাদের দুর্নীতির কয়েকটি খতিয়ান অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে:
* প্রাক্তন প্রকৌশলী তুষার কান্তি সরকারের কাছে কর্পোরেশনের পাওনা ১ লক্ষ টাকা আদায় না করে, এই সিন্ডিকেট নিজেদের মধ্যে তা ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করেছে।
* প্রাক্তন ব্যবস্থাপক মোকবুল হোসেনের দুর্নীতির ফাইল গোপন করার শর্তে তার কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন নুরুল কবির। এই কাজে ব্যবস্থাপক (পার্সোনাল) মোঃ আব্দুল বাকী তাকে সহায়তা করেছেন।
* একইভাবে, আরেক প্রাক্তন ব্যবস্থাপক জামিল আক্তার বকুলের কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে দুর্নীতির প্রমাণ গোপন করে দেনা পাওনা পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে।
* পে-স্কেল ফিক্সেশন বা বেতন নির্ধারণ করার নাম করে ১৭ জন কর্মচারীর কাছ থেকে জনপ্রতি ২ লক্ষ টাকা করে ঘুস নিয়েছেন নুরুল কবির, যেখানে ফৌজিয়া জাফরীন তাকে সহায়তা করেছেন।
দুদক ও মন্ত্রণালয়ে তদন্তের দাবি:
লিখিত অভিযোগটিতে নুরুল কবির কখনো নিজেকে বিএনপি আবার কখনো জামায়াতের লোক দাবি করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান এবং বিএফআইডিসির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগের অনুলিপি প্রেরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এমন সংঘবদ্ধ দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে তা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রণালয় ও দুদক এই বিষয়ে কত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।









