রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর আজ, ২০ বছরেও অমীমাংসিত বিচার
মানব কথা ডেস্ক:
আজ ২৮ অক্টোবর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রক্তাক্ত দিন। ২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানীর পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে সারা দেশে ১৩ জন নিহত হন। রাজধানীতে নিহতদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ছয় নেতাকর্মী এবং ছাত্রমৈত্রীর একজন কর্মী ছিলেন। আহত হন অন্তত এক হাজার মানুষ। লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে আলোচিত ওই ঘটনা সে সময় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্ক, সহিংসতার দায় নির্ধারণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় রয়েছে। ঘটনার পর হত্যা মামলা হলেও পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহার করা হয়। ফলে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। তাঁকে ওই দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দিতে আন্দোলন করছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ২৭ অক্টোবর রাতে কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরদিন রাজধানীতে পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে, বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এবং জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেয়। সংঘর্ষের আশঙ্কায় পল্টন ময়দান ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে ২৮ অক্টোবর পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, তাদের পূর্বনির্ধারিত সমাবেশস্থলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা নিয়ে হামলা চালান। সেদিনের সংঘর্ষে প্রাণহানি ও ব্যাপক হতাহতের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠে আসে। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগ পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে। ঘটনার পর রাজধানীর পল্টন থানায় হত্যা মামলা করা হয়। ২০০৭ সালে তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা স্থগিত করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের আগস্টে আদালত মামলা প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করেন। এর ফলে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম আর এগোয়নি। মামলা প্রত্যাহারের পর হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও আলোচনা অব্যাহত থাকে। ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, তাঁরা মামলাটি আবার আইনিপ্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, মামলা প্রত্যাহারের পর প্রয়োজনীয় নথির সত্যায়িত অনুলিপি পেতে বারবার আবেদন করেও তাঁরা তা পাননি। তবে মামলাটি পুনরায় চালুর বর্তমান আইনি অবস্থা, সংশ্লিষ্ট আদালতের সর্বশেষ আদেশ এবং নথি সংগ্রহের আবেদনের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। সেদিনের প্রাণহানি, সহিংসতার দায় এবং মামলার পরিণতি নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।









